মাইদুল ইসলাম (কুড়িগ্রাম): চিলমারীর বালু উত্তোলন বন্ধ—এমন খবর এখন প্রায় নিয়মিত শোনা যায়। প্রশাসনের বক্তব্যও স্পষ্ট: বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কাগজে-কলমে সবকিছু ঠিকঠাক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাস্তবে কি সত্যিই বালু উত্তোলন বন্ধ হয়েছে?

সরেজমিনে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। কিছুদিন আগে ইউএনও অফিসে এক আলোচনায় শোনা গিয়েছিল, প্রশাসন না পারলেও স্থানীয়ভাবে পাঁচ মিনিটে বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব। বাস্তবে তা হয়েছিলও—তবে মাত্র দু’দিনের জন্য। এরপর আবার আগের মতোই শুরু হয়েছে বালু উত্তোলন।

এখন অনেকেই বলবেন, রাস্তায় তো বালুর ট্রাক দেখা যায় না, বালুর পয়েন্টগুলোও বন্ধ। তাহলে বালু উত্তোলন হচ্ছে কীভাবে? কিন্তু স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা বলছে, উত্তোলন বন্ধ হয়নি—বরং পদ্ধতি বদলেছে।

চিলমারীর রমনা, জোড়গাছ, কাঁচকোল, পুটিমারী ও ফকিরের হাটের বালুর পয়েন্টগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ। কিন্তু গভীর রাতে, বিশেষ করে রাত দুইটার পর, বাল্কহেডের শব্দে এলাকার মানুষের ঘুম ভেঙে যায়। শব্দ এতটাই তীব্র যে থানাহাট বাজার পর্যন্ত তা শোনা যায়। আগে এসব পয়েন্টে ছোট ও মাঝারি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বালু উত্তোলন হতো। এখন সেই পয়েন্টগুলো বন্ধ থাকলেও নদীর বুকে রাতের আঁধারে নির্বিঘ্নে চলছে বালু তোলা।

এই নতুন সিন্ডিকেট কারা—তা এখনো স্পষ্ট নয়। আগে যারা বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল, তারা ছিল মূলত ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের সিন্ডিকেট। বৈধ লাইসেন্স না থাকায় তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে প্রশাসনের কিছু স্তর পর্যন্ত নিয়মিত চাঁদা দিতে হতো। স্থানীয় পাতি নেতা থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের নেতাদেরও ভাগ দিতে হতো এই ব্যবসা থেকে।

বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। রাতের অন্ধকারে চিলমারী থেকে বালু উত্তোলন করে নদীপথে গাইবান্ধার বালাসি ঘাট, রৌমারী, রাজীবপুর এবং কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। সড়কপথ এড়িয়ে নদীপথ ব্যবহার করায় বিষয়টি অনেকটাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

এখানেই মূল প্রশ্নগুলো সামনে আসে। যদি চিলমারী থেকেই বালু উত্তোলন করা হয়, তাহলে কেন চিলমারীর নির্ধারিত বালুর পয়েন্টগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে না? এই বড় সিন্ডিকেট কারা? তাদের নেপথ্যে কারা রয়েছে? অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে কেন চিলমারীর নদীতীরকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে?

পরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের বিরোধিতা করার কোনো যুক্তি নেই। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নির্মাণকাজ—সবকিছুর জন্যই বালু প্রয়োজন। কিন্তু সেটি হতে হবে নীতিমালা মেনে। জেলা প্রশাসন নদী নীতি ও জলমহল ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করে নিবন্ধিত বাল্কহেডের মাধ্যমে অনুমোদিত ঠিকাদারদের বালু উত্তোলনের সুযোগ দিতে পারে। এতে একদিকে যেমন শৃঙ্খলা থাকবে, অন্যদিকে পরিবেশ ও নদীতীরও সুরক্ষিত থাকবে।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—চিলমারীর অংশ থেকে কার ইন্ধনে এই বালু উত্তোলন চলছে? স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনের কেউ কি এই বড় সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত? কুড়িগ্রাম–৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য, কিংবা কুড়িগ্রাম–২ ও কুড়িগ্রাম–৩ আসনের প্রতিনিধিরা—তাদের কেউ কি এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত? যদি তারা জড়িত থাকেন, তবে এটিকে বড় সিন্ডিকেট বলা যায়। আর যদি তাদের থেকেও বড় কোনো শক্তি এর পেছনে থাকে, তাহলে সেই অদৃশ্য শক্তি কারা?

চিলমারীর মানুষের দাবি খুবই সরল। যদি বালু উত্তোলন করা হয়, তবে তা অবশ্যই অনুমোদিত ও পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। চিলমারীর এলাকায় বালু উত্তোলন হলে সেটি চিলমারীর নির্ধারিত বালুর পয়েন্ট থেকেই হতে হবে। রাতের আঁধারে যারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

অন্যথায় মানুষের মনে প্রশ্ন জাগবেই—বালু উত্তোলন কি সত্যিই বন্ধ, নাকি কেবল চোখের আড়ালে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে?

চিলমারীর নদী, তার তীর, এবং এই অঞ্চলের পরিবেশ কোনো অদৃশ্য সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ুক—এটা কেউই চায় না। এখন সময় এসেছে সত্য প্রকাশের, এবং দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার।