লেখক: মুহাম্মদ আবু সাঈদ 

সাংবাদিকতার কোনো রং হয় না। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এর ওপর কিছুটা ‘হলুদ’ রংয়ের আঁচড় পড়ে। সময় বদলেছে। গণমাধ্যমে ‘গণ’ গৌণ হয়ে কখনো-সখনো তা হয়ে যাচ্ছে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক। ব্যক্তি তথা সাংবাদিকের অজ্ঞতা বা না-জানার অন্ধকার দিক, অর্থাৎ কালো দিকটাই আলো-ঝলমলে হয়ে উঠছে কোনো-কোনো ক্ষেত্রে। সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় আসা যাক।

একজন সরকারি কর্মচারী তাঁর জন্য বরাদ্দ থাকা সরকারি গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন। সাথে তাঁর সহকর্মীরা। রাস্তার পাশে থাকা দোকান থেকে তিনি ফুলের টব কিনছেন। একটি বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভিডিও কন্টেন্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে- ‘সরকারি প্রটোকল ভেঙে ব্যক্তিগত কাজে জেলা প্রশাসকের গাড়ির ব্যবহার’। এখানে কয়েকটি প্রশ্ন: এক. কোন সরকারি প্রটোকল ভাঙা হলো? দুই. কীভাবে সরকারি প্রটোকল ভাঙা হলো? তিন. ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের কী প্রমাণ রয়েছে? চার. সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যায় না- এমন আইনি রেফারেন্স বা সংশ্লিষ্ট কারো বক্তব্য কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর ওই সংবাদে পাওয়া যাবে না। শুধু তা-ই নয়, সংবাদের মূল যে বিষয় ‘ষড় ক’ (কে, কী, কেন, কোথায়, কখন, কীভাবে) সেটিও কোথাও পাওয়া যাবে না। তাহলে দুই মিনিট ৪৪ সেকেন্ডর ওই সংবাদে কী আছে? পর্যায়ক্রমে আসা যাক।

শুরুতেই গানম্যান ও গাড়ির ড্রাইভারকে সাংবাদিক প্রশ্ন করছেন, ‘গাড়িতে কে আছেন বলবেন কি?’ যাঁদের প্রশ্ন করা হলো তাঁরা ইঙ্গিতে বোঝালেন যে, তাঁরা বলবেন না। মনমতো উত্তর না পেয়ে প্রায় ২৫ বার তিনি প্রশ্নটি করেছেন। বারবার প্রশ্ন করে তিনি উত্তর দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন। সাংবাদিকতার সর্বজনস্বীকৃত আচরণবিধি অনুযায়ী কাউকে কথা বলার জন্য জোর করা যায় না বা বাধ্য করা যায় না। কিন্তু এখানে সাংবাদিক সেই অপচেষ্টা করেছেন। আবার, ক্যামেরা চালু করে অনুমতি না নিয়েই তিনি মুখের সামনে বুম বা মাইক্রোফোন ধরেছেন এবং সেটি প্রচার করেছেন। প্রশ্নমালার এক ফাঁকে সাংবাদিক ড্রাইভারকে বললেন, ‘আজকে তো বন্ধের দিন (ঈদের পরের দিন)। সরকারি গাড়িটি আপনারা ব্যক্তিগত কাজে লাগাচ্ছেন।’ তার মানে, সাংবাদিকের জ্ঞান বা বিদ্যা হলো যে, বন্ধের দিনও সরকারি কাজ বন্ধ থাকে। আবার, ব্যক্তিগত কাজে গাড়িটি ব্যবহার করা হচ্ছে এটা তিনি কীভাবে বুঝলেন? নাকি সরকারি লোক বন্ধের দিনে কোনো কাজ করলে সেটি ব্যক্তিগত কাজ হিসেবে পরিগণিত হয়? নাকি ফুলের টব শুধু ব্যক্তিগত ভবনে বা স্থানেই থাকে, সরকারি স্থানে বা ভবনে থাকে না? তিনি কীভাবে ফুলের টব কেনাকে ব্যক্তিগত কাজ ধরে নিলেন, তা সংবাদে তুলে ধরা হয়নি।

শেষের দিকে ড্রাইভারের উদ্দেশে সাংবাদিককে বলতে শোনা যায়, ‘একটু তো বলতে হবে, ভাইয়া।’ বলতে হবে কেন? বলতে যে হবে, এই যে বাধ্যবাধকতা, এই ‘শেখা’ রিপোর্টার শিখলেন কোত্থেকে? আবার, ড্রাইভার ও গানম্যান, দুইজনই যখন গাড়ির দরজার বন্ধ করতে যাচ্ছেন, তখনই রিপোর্টার দৈহিক শক্তি প্রয়োগ করে বাধা দিচ্ছিলেন। প্রশ্ন এসে যায়, সাংবাদিকের এই অধিকার কে দিয়েছে? আবার, সাংবাদিকই উল্টো গানম্যানকে প্রশ্ন করলেন, ‘ধাক্কা মারছেন কেন?’ মানুষের চলাফেরার মৌলিক অধিকারে সাংবাদিকই বাধা দিলেন, আবার তিনিই ‘উল্টো’ দায় চাপালেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের ওপর। এই হলো মোটামুটি পুরো নিউজ।

এই সংবাদটি প্রচারের পাঁচ ঘণ্টার মাথায় প্রায় অর্ধকোটি ভিউ হয়েছে। অর্ধকোটির মাধ্যমে আরও কয়েকগুণ মানুষ জেনেছেন এই খবর। এই যে, নিয়মনীতির ‘বালাইবিহীন’ একটা সংবাদ প্রচারিত হলো, এর দায় কার? সরকারি প্রটোকল ভাঙা হয়েছে মর্মে খবরের শিরোনামে বলা হয়েছে। কিন্তু এখানে সাংবাদিকতার প্রটোকলই তো ভাঙা হলো। প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর ১১(বি) ধারা অনুযায়ী প্রণীত হয়েছে ‘বাংলাদেশের সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা এবং সাংবাদিকদের জন্য আচরণ বিধি, ১৯৯৩’। এর ৪ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত হতে হবে। কিন্তু বর্ণিত প্রতিবেদনে এসবের কিছুই করা হয়নি। ২৩ নং অনুচ্ছেদে নারী সংক্রান্ত প্রতিবেদন বা ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিককে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে মর্মে নির্দেশনা রয়েছে। গাড়িতে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারী ছিলেন, যিনি একজন নারী, এক্ষেত্রে আচরণবিধির কিছুই মানেননি ওই সাংবাদিক। বরং বারবার তাঁর দিকে ক্যামেরা তাক করে বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪-এর ৫.১.৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত বা গোপনীয় বা মর্যাদা হানিকর তথ্য প্রচার করা যাবে না।’ এখানে মর্যাদা হানিকর কাজ হয়েছে।

এস্টাব্লিশমেন্ট ম্যানুয়েল (ভলিউম-২)-তে ১৯৮২ সালের একাধিক পরিপত্র রয়েছে যে, সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে শর্তসাপেক্ষে ব্যবহার করা যাবে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একটি পরিপত্র জারি করে, যেখানে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভাড়ার নির্ধারিত হার বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এতসব না জেনে, বা না জানার চেষ্টা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে যার দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকের পাশাপাশি সম্পাদনায় জড়িতদের ওপরও বর্তায়। কারণ ১৯৯৩ সালের আচরণ বিধি সংশ্লিষ্ট সকলের ওপরেই প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে তাঁদের অজ্ঞতার ‘কালো’ দিকটি বেশ জোরেশোরেই প্রকাশিত হয়েছে। এটিকে ‘কালো’ সাংবাদিকতা নামেও অভিহিত করতে চান সচেতন পাঠক ও দর্শকদের কেউ কেউ।

ঈদের আগের আরেকটি নিউজের বিষয়টি তুলে ধরা যাক। একটি জেলায় এক নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে তাঁরই এক নারী সহকর্মী যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনলেন। প্রথম দিন জানা গেল শুধু অভিযোগকারী ও অভিযুক্তের বক্তব্য। কিন্তু পরদিনই কয়েকটি পত্রিকার খবরে জানা গেল যে, অভিযোগকারী চাতুরির আশ্রয় নিয়েছেন। সিসিটিভির ফুটেজ ও অফিসের অন্যান্যদের বক্তব্যে সেটির কিছুটা প্রমাণও নাকি পাওয়া গেছে। তাহলে প্রথম দিনই সেই চেষ্টা করা হলো না কেন? ২০১০ সালের ১২ এপ্রিল ‘মিডিয়াওয়াচ’ পত্রিকার নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ‘বিতর্কিত বিষয়ে দুইপক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য তুলে ধরলেই কি তার (প্রতিবেদকের) দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? এ ধরনের বক্তব্য শুনে সাধারণ মানুষ যে বিভ্রান্ত হচ্ছে, সেই বিভ্রান্তি দূর করা কি গণমাধ্যমের দায়িত্ব নয়? সত্য নিয়েই তো গণমাধ্যমের কারবার। আর সত্য প্রতিষ্ঠা করাও তাদের পবিত্র দায়িত্ব।’

এই পবিত্র দায়িত্ব পালনে কোনো-কোনো ক্ষেত্রে ব্যাপক উদাসীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সত্য বলা ও প্রচার করা যার দায়িত্ব, তিনি যখন ন্যূনতম চেষ্টাও করেন না, তখনই অপেশাদারসুলভ আচরণ চলে আসে। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবাদমাধ্যমগুলো সত্য বলবে এবং পুরো সত্য বলবে। সত্যকে খণ্ডিত করে বলার অর্থ দাঁড়ায় মিথ্যা বলা এবং তা বস্তুনিষ্ঠতার লঙ্ঘন। সংবাদে ঘটনার বিবরণ থাকবে, সংবাদ বানানোর চেষ্টা থাকবে না। সংবাদ জানানোর চেয়ে দেখানোটাই মুখ্য হলে বিপত্তি বাড়ে।

অস্বীকারের উপায় নেই, ‘ভিউ’ এখন একটা বড় ফ্যাক্টর। বেশি ভিউ মানেই বেশি ইনকাম। ব্যবসা। তর্কের খাতিরে ব্যবসা ধরে নিয়ে বলা যায়, ব্যবসারও তো নিয়ম-নীতি ও নৈতিকতা রয়েছে। ‘সংবাদ-ব্যবসায়’ সেটিও কি থাকবে না? মানুষ তো গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করে। সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করে অন্যায় কিছু করলে একদিকে যেমন গণমাধ্যম বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, অন্যদিকে প্রতিবেদক নিজেও প্রশ্নবিদ্ধ হন; আর বিভ্রান্ত হন সাধারণ মানুষ। তাছাড়া সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজে, অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।

এ-কথা সত্য যে, গণমাধ্যম ইতিহাস লিখে যায়। সাংবাদিক ইতিহাসের বর্ণাঢ্য স্রোতধারায় অবস্থান করে হাজারো তথ্যের ভিড়ে সেখান থেকে বেছে-বেছে সংগ্রহ করেন প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য-উপাত্ত। এরজন্য দরকার বাইফোকাল মাইন্ড, প্রয়োজন হয় ‘নৌজ ফর নিউজ’ (সংবাদের গন্ধ শোঁকার নাক)। নিউজ করা হবে কি না- এমন ক্ষেত্রে প্রতিবেদকের ‘ইচ্ছাই যথেষ্ট’ হওয়া উচিত নয়। নিউজ-সেন্স বা সংবাদ-বোধের বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এখন তথ্যের অবাধ প্রবাহ বাড়ছে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে দুইটি তারিখ থাকতো। ঢাকার জন্য ৩ তারিখ হলে, মফস্বলের জন্য লেখা হতো ৪ তারিখ। কোনো কোনো ঘটনার দু’দিন পর ঢাকার বাইরের মানুষ সেটি জানতে পারতেন। সেই জায়গায় এখন মানুষ সেকেন্ডের মধ্যেই সব খবর জানতে পারছেন। দিনে দিনে গণমাধ্যমের সংখ্যাও বাড়ছে। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে (খন্ড ১৩) ১৮৫৭ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ববঙ্গে প্রকাশিত হয় ৭৬টি সংবাদপত্র, যেগুলোর সবই ছিল সাপ্তাহিক, অর্ধ-সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১ জুলাই দেশের তালিকাভুক্ত পত্রিকা ছিল ৪৫৭টি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই সংখ্যা তিন হাজার ৩৪৭টি। বর্তমানে নিবন্ধিত স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ৫৫টি। এখন নিমিষেই মানুষের কাছে সব তথ্য পৌঁছানো সম্ভব।

সংবাদ পৌঁছানোর গতি বেড়েছে, সংবাদমাধ্যম বেড়েছে, সংবাদমাধ্যমের ধরন বেড়েছে, সাংবাদিকও বেড়েছে। কিন্তু সাংবাদিকতার মান? সেটি কি বেড়েছে? কখনো-কখনো অজ্ঞানতার ‘কালো’ দিক কি সেটিকে আড়াল করে দিচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো সামনে আসছে। প্রেস কাউন্সিলে কী রকম মামলা হচ্ছে? মামলা দায়েরের পদ্ধতি কী? কতজনের এ পর্যন্ত শাস্তি হলো- সেসব খবর সেভাবে আমরা পাচ্ছি না। প্রেস কাউন্সিলের শাখা বিভাগীয় পর্যায়েও আনা যায় কি না সেটি ভাবা প্রয়োজন। সরকারি সেবার ক্ষেত্রে যেমন জিআরএস (অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা) রয়েছে, প্রত্যেকটি গণমাধ্যমেরও সেরকম ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। পিআইবির’র প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ হচ্ছে কি না? জার্নালিজম রিভিউ সংক্রান্ত পত্রিকা প্রয়োজন। সেটি গঠনমূলক সমালোচনা করবে, অযথা হয়রানি করবে না। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কতদূর? সেটিও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। আর এ সবকিছুই প্রয়োজন গণমাধ্যম ও দেশের স্বার্থে।

মুহাম্মদ আবু সাঈদ: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।