লেখক: প্রফেসর মীর্জা মো:নাসির উদ্দিন।
আমরা অরক্ষিত
প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর কুড়িগ্রাম জেলায় গড়ে ৮ থেকে ১৫ জন মানুষ এবং অসংখ্য গবাদি পশু বজ্রপাতে প্রাণ হারালেও ব্রজপাতের ঝুকি তালিকায় কুড়িগ্রাম জেলা নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে দেশের ২০টি জেলার শতাধিক উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে লাইটিং এরেস্টার বা বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো হয়েছে। কিন্তু জানামতে কুড়িগ্রামে এরুপ লাইটিং এরেস্টার বা বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো হয় নি।
তালগাছ পরিচিতি
তালগাছ একটি একবীজ পত্রী উদ্ভিদ এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম Borassus flabellifer, পরিবার: ‘এরিকাসি’ (Arecaceae). তাল গাছ পাম গোত্রের অন্যতম দীর্ঘ গাছ যা উচ্চতায় ৩০ মিটার বা ১০০ ফুট পর্যন্ত পৌছতে পারে। তালগাছের আদি নিবাস এশিয়া ও আফ্রিকা। তালের কোনো অনুমোদিত জাত বা শ্রেণি নেই। তবে এদেশে বিভিন্ন আকার ও রংয়ের তাল দেখা যায়। আবার কোনো কোনো তাল গাছে কম বেশী বার মাসই তাল ধরে থাকে।এটি একটি ভিন্নবাসী উদ্ভিদ, পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা গাছে উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশের সব এলাকায় কমবেশী তাল উৎপাদন হলেও ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, রাজশাহী ও খুলনা এলাকায় সবচেয়ে বেশী উৎপাদন হয়।
বজ্রপাত ও তালগাছ
বজ্রপাত সাধারণত উঁচু বস্তুর ওপর আঘাত হানে। বৈজ্ঞানিকভাবে বলা যায়, বজ্রপাত যখন ঘটে; তখন আকাশে সৃষ্ট বৈদ্যুতিক চার্জ দ্রুত মাটিতে নামার পথ খোঁজে। উঁচু ও সোজা গাছ সেই চার্জের জন্য সহজ পথ তৈরি করে। তালগাছের গঠন এমন যে, এটি বিদ্যুৎকে মাটিতে প্রবাহিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সাধারণত একটি তালগাছ ৯০ থেকে ১০০ ফুট উঁচু হওয়ায় বজ্রপাত সরাসরি এ গাছের মাধ্যমে মাটিতে গিয়ে আমাদের রক্ষা করে। তালগাছ মূলত একটি প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক দণ্ড হিসেবে কাজ করে আশেপাশের সীমিত এলাকাকে বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা করে। এটি বজ্রপাতকে পুরোপুরি থামিয়ে দেয় না, বরং নিজের দিকে আকর্ষণ করে মানুষের জীবন বাঁচায়।
তালগাছ মডেল
বজ্রপাত নিরোধে তালগাছের ব্যবহার প্রথম থাইল্যান্ডে শুরু হয় তবে কবে থেকে শুরু হয় তার সঠিক সময় কারও জানা নেই।তবে আগে থেকেই থাইল্যান্ডের জমির আল, ফাঁকা জায়গা,রাস্তার ধারে, শিক্ষা প্রাতিষ্ঠান ও অফিস আদালতে প্রচুর তালগাছ ছিল। থাইল্যান্ডে প্রচুর বজ্রপাত হতো কিন্তু সে তুলনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুবই কম। বিভিন্ন পর্যালোচনায় দেখা যায় থাইল্যান্ডে প্রচুর উচু তালগাছ থাকায় বজ্রপাত জনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুবই কম। এরুপ বাস্তবতায় তালগাছ থাইল্যান্ডে বজ্রপাত রক্ষায় মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়।বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সাল থেকে থাইল্যান্ডের এই তালগাছ মডেলটিকে গ্রহণ করে দেশে সর্বত্র তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে।২০১৭ সালেই ২ লাখ তাল বীজের চারা রোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করে। সাধারণ মানুষ মনে করেছিল তালগাছ বজ্রনিরোধক।
বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন!
একটি তালগাছ বড় হতে সময় লাগে প্রায় ১৫-২০ বছর। অর্থাৎ তালগাছের মাধ্যমে বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়। তাছাড়া কোন তালগাছে বজ্রপাত পড়লে সে গাছটি সাধারণত; বাঁচে না। আজকে তালগাছ লাগালে ২০ বছর পর এটি কাজে লাগতে পারে। আবার গাছ মারা গেলে ২০ বছরের জন্য আবারো সুরক্ষা নষ্ট হয়ে যায়। থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রে যেটি হয়েছিল সেটা হলো আগে থেকেই তাদের অসংখ্য তালগাছ ছিল। আমাদের প্রেক্ষাপটে যেটি বাস্তবতা তাহলো শুধু তালগাছ নয় যে কোন ধরণের বড় বড় গাছের সংখ্যা যত বাড়বে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি থেকে ততটাই রক্ষা পাওয়া যাবে।
আসল সুরক্ষা:
লাইটনিং অ্যারেস্টার (Lightning Arrester) হলো একটি অত্যাধুনিক সুরক্ষামূলক প্রকৌশল প্রযুক্তি, যা বজ্রপাতের উচ্চ-ভোল্টেজ বিদ্যুৎ শক্তিকে ভবনে বা বৈদ্যুতিক লাইনে আঘাত করতে না দিয়ে সরাসরি ও নিরাপদে মাটির নিচে পাঠিয়ে দেয়। এটি মূলত ভবনের কাঠামো, মানুষ এবং মূল্যবান ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার একটি বৈজ্ঞানিক ঢাল।লাইটনিং অ্যারেস্টারের সূক্ষ্ম মাথাটি বাতাসের আয়নাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আকাশের বিদ্যুৎকে অন্য কোথাও পড়তে না দিয়ে সরাসরি নিজের দিকে টেনে নেয়।বজ্রপাত অ্যারেস্টারে আঘাত করার সাথে সাথে এর বিপুল ভোল্টেজ ও কারেন্ট (যা প্রায় ৩০,০০০ অ্যাম্পিয়ার পর্যন্ত হতে পারে) ডাউন কন্ডাক্টরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর ফলে বিদ্যুৎ ভবনের কোনো ক্ষতি করতে পারে না।আর্থিং সিস্টেমের মাধ্যমে সেই বিপজ্জনক বিদ্যুৎ শক্তি কোনো বিস্ফোরণ বা আগুন না জ্বালিয়ে সরাসরি মাটির গভীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।একটি তালগাছ কেবল তার নিজের ও তার অতি নিকটবর্তী সামান্য অংশের ওপর পড়া বজ্রপাত গ্রহণ করতে পারে, লাইটনিং অ্যারেস্টারের মতো বিশাল এলাকার সুরক্ষা এর পক্ষে সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) প্রধানত দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি জেলায় ৩৩৫টিরও বেশি লাইটনিং অ্যারেস্টার (বজ্র নিরোধক দণ্ড) পাইলট প্রকল্প হিসেবে স্থাপন করেছে। এটি সুরক্ষার লেভেল (Level I to IV) এবং খুঁটির উচ্চতার ওপর ভিত্তি করে প্রায় ৭,০০০ থেকে ৪৫,০০০ বর্গমিটার এলাকা বজ্রপাত মুক্ত রাখতে পারে। ফলে একটি বড় আবাসন প্রকল্প, শিল্পকারখানা বা পুরো একটি ফসলি মাঠ একটিমাত্র ডিভাইস দিয়েই সুরক্ষিত করা সম্ভব।
লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল),কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ,কুড়িগ্রাম।
