বিশেষ প্রতিনিধি: জার্মানির বন শহরে চলমান জাতিসংঘ জলবায়ু আলোচনায় (এসবি৬৪) জলবায়ু অর্থায়ন ও ক্ষয়ক্ষতি ইস্যুতে আরও দৃঢ় ও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। দেশটি অনুদান-ভিত্তিক অভিযোজন অর্থায়ন, লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল দ্রুত ও কার্যকর করা, কার্বন বাজারে বিস্তৃত প্রবেশাধিকার, সবুজ কর্মসংস্থান এবং ন্যায্য রূপান্তর (জাস্ট ট্রানজিশন) নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের রাষ্ট্রীয় মন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলামসহ অন্যান্য জলবায়ু আলোচকরা। প্রতিনিধিদলের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়বিশেষ করে অর্থায়ন, অভিযোজন, উন্নয়ন ও জাস্ট ট্রানজিশনের সংযোগস্থলে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বাস্তবতা আরও শক্তভাবে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের অবস্থান অনুযায়ী, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে শুধু ক্ষয়ক্ষতির ভুক্তভোগী হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু সমাধান ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নের পথ নির্ধারণে সক্রিয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
বন আলোচনা সাধারণত কপ সম্মেলনের প্রস্তুতিমূলক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হলেও, এ বছর সেখানে জলবায়ু প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান কমানোর চাপ স্পষ্ট। একই সঙ্গে অর্থায়ন, ন্যায্যতা, জাস্ট ট্রানজিশন এবং জ্বালানি রূপান্তরের গতিকে ঘিরে আলোচনা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ এখন অংশগ্রহণের পাশাপাশি জলবায়ু দরকষাকষিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দাবি হলো অনুদান-ভিত্তিক অভিযোজন অর্থায়ন। প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ জানিয়েছেন, “ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনের বাস্তবতায় অভিযোজন এখন ভবিষ্যতের বিষয় নয়। এটি টিকে থাকার চলমান ব্যয়। এসব খরচই জলবায়ু কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অংশ।”
বাংলাদেশের অভিযোগ, বিদ্যমান জলবায়ু অর্থায়নের বড় অংশই ঋণভিত্তিক, যা ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। ঢাকা বলছে, এই অর্থায়ন আরও বেশি অনুদানভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন।
লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল দ্রুত ও কার্যকরভাবে চালুর বিষয়েও বাংলাদেশ জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যক্ষ প্রবেশাধিকার, দ্রুত অর্থ ছাড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা ও দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা ক্ষতির মতো ধীরগতির জলবায়ু প্রভাবকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।
অর্থায়নের পাশাপাশি গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপটেশন, গ্লোবাল স্টকটেক, এনডিসি নির্দেশিকা, স্বচ্ছতা কাঠামো, সামুদ্রিক জলবায়ু সংযোগ এবং জাস্ট ট্রানজিশন নীতিতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারগুলো অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির অংশ হিসেবে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর জাতীয় উদ্যোগ, নার্সারি উন্নয়ন, কমিউনিটি ফরেস্ট্রি ও স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় কয়েক লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কর্মসূচিতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ীত্বশীলতা নিশ্চিত করতে বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রজাতি নির্বাচন ও সঠিক পরিবেশগত নকশা জরুরি।
একই সঙ্গে জলবায়ু পদক্ষেপকে শুধু ব্যয় নয়, অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবেও দেখছে বাংলাদেশ। প্যারিস চুক্তির আর্টিকেল ৬-এর আওতায় কার্বন বাজারে অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, শক্তিশালী মনিটরিং, রিপোর্টিং ও যাচাইকরণ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে জলবায়ু প্রকল্পে বিনিয়োগ ও সম্ভাব্য রাজস্বের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বৃহত্তর জলবায়ু কৌশলে ২০৪০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে অর্জনের লক্ষ্য, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি বিশেষ করে পানি-সাশ্রয়ী ধান চাষ, গার্মেন্টস ও শিল্প খাতে জাস্ট ট্রানজিশন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন কাঠামো কনভেনশন (ইউএনএফসিসি)-এর অধীন সাবসিডিয়ারি বডির ৬৪তম অধিবেশন (এসবি৬৪) গত ৮ জুন জার্মানির বন শহরে শুরু হয়, যা আগামী দুই সপ্তাহ চলবে। বিশ্বজুড়ে ৭,০০০-এর বেশি প্রতিনিধি এতে অংশ নিচ্ছেন, যার মধ্যে সরকারি আলোচক, নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা রয়েছেন। এই আলোচনা আগামী নভেম্বরে তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য কপ৩১-এর আলোচ্যসূচি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
#SB64
