ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি: ফেসবুকের কল্যাণে আমরা ভিনদেশীদের অনেক মজার দিবস পালনের কথা জানতে পারি। এই ধরুন আজ, মানে ১৭ সেপ্টেম্বর নাকি স্ত্রীর প্রশংসা দিবস। কয়েক বছর আগে এই দিনেই এক কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছিলাম।

কয়েকমাস থেকেই মৌসুমীর গলায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। গোটা চারেক গলা বিশেষজ্ঞ দেখিয়েও কোন ফল পেলামনা। তো বিজাতীয় সংস্কৃতির আদলে সকালে উঠেই বউকে বললাম, তুমি যদি একটু চর্চাটা করতে, তাহলে এতো কষ্ট করে শ্রেয়াকে ড্রয়িংরুমে ঢুকাতাম না। ভেবেছিলাম বলটা গুড লেন্থেই পিচ করেছে। কিন্তু আমার গর্দভের মতো শব্দ চয়নে বাউন্স ব্যাক করে আমার দিকেই বল তীর বেগে ছূটে আসলো। শান্ত, কিন্ত স্থির চোখে তাকিয়ে বউ হাতের রুটির লই ফেলে দিয়ে বেলন তুলে বললো, তা ক’ঘন্টা ছিলো তোমার শ্রেয়া না ফ্রেয়া!
তাইতো বলি, কেনই বা আমাকে আদর করে বোনের বাড়ি উত্তরা পাঠানো হলো! কেনই বা একুরিয়ামের চৌবাচ্চা ডানদিকে কাত হয়ে আছে! তোমার এই লেবাস?আমাকে এখনো এই এঁটো ঘরেই থাকতে হবে? গলাটা ক্রমেই বি ফ্লাট থেকে এফ শার্প এ উঠে গিয়েছে। আমাকে একটা উত্তর দেবার সুযোগ না দিয়েই তিনি একপেশে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। তার ঢোক গেলার সুযোগেই টুপ করে চান্সটা নিলাম এবার।
আরে পাগলি আমি শ্রেয়া ঘোষালের কথা বলেছি।তুমি নির্জন উপকূলে নায়িকার মতো টাইপের গান শুনিয়ে আমাকে কতদিন তুমি অকূলে ভাসিয়েছো! আজ তোমার গলার একটু অসুখ হয়েছে বলে কানে এয়ারপড দিয়ে পরস্ত্রীর গান শুনতে হবে!মাওয়া ঘাটের ইলিশের লেজ ভর্তার চাইতে বাড়ির তৈরি কাঁচা কলার ভর্তাই আমার কাছে অমৃত। কথায় কথায় উপমার বাহুল্য যে বিপদ ডেকে আনতে পারে তা আবার বুঝলাম।
কি? আমাকে তুমি কাঁচকলা ভাবো? ওকে থাকো তোমার সংসার নিয়ে।
মা গো, মা,তুমি… তুমি যদি আমাকে কাঁচকলাই বানিয়ছিলে তবে এই বাঁদরের গলায় না ঝুলিয়ে কলার গাছেই ঝুলিয়ে রাখলেনা কেন মা? এই বাঁদরের চেয়ে বাদুড়ের আদরই নির্মোহ ছিলো মা।
হঠাৎ বিধাতা আমাকে নিজ হাতে যেন তুলে ধরলেন।
এই সোনা শোন?
খবরদার, আমাকে সোনা, চাঁদি এই নামে ডাকবেনা বলছি। তারচেয়ে লোহা, বাঁদি এগুলো বলবে। মিনসের মুখটা খামচে দিতে পারলে ভালো হতো! তাকে তেড়ে আসতে দেখে বিড়বিড় করে বললাম, প্রাণটা বাঁচাও গো…..।
কি বললে তুমি? প্রাণ গোপাল? মানে তুমি আমাকে প্রাণ গোপাল স্যারের কাছে চিকিৎসা করাবে? আমি না বুঝেই ঘাড় নাড়লাম। হ্যাঁ, হ্যাঁ তো, প্রা….ণ গো….পা….ল স্যারকেই দেখাবো। এই রোগের জন্য প্রাণ গোপাল স্যার রোগীদের কাছে সাক্ষাৎ গোপাল যেন! কিন্তু গরীবের ঘোড়া রোগ হলে যা হয়! উনার কাছে সিরিয়াল পেতেই তো দুই মাস। তারপরেও প্রাণ রক্ষার জন্য সেই সময় বাড়িয়েই বললাম, কালকেই তোমাকে ওখানে নিয়ে যাচ্ছি।
সকালটা হঠাৎ করে কোমল হয়ে গেলো। রুটির সাথে সুজি, ডিম পাতে তুলে দিতে দিতে বউ গা ঘেঁসে এসে জানতে চাইলো, হ্যাঁগো, কালকেই যাচ্ছি তো!
একদম পাক্কা কথা দিলাম কালকেই যাচ্ছি মাধবীলতা! এবার ভালোবাসার ফোয়ারা ছুটিয়ে মাধবিলতার কান্ডের মতোই জড়িয়ে ধরে চুলে বিলি দিতে দিতে বললো, তুমি কিন্তু নিজের যত্ন একেবারেই নিচ্ছনা। আরেক টা রুটি নিলে কি ওমন হয়! আমি রুটি চিবুচ্ছি আর আবার ভবিতব্য নিয়ে ভিতরে ভিতরে ঠিকই ঘামছি। কি করে তাকে বলবো, প্রাণ কে আমার?

এক্ষেত্রে ত্রাতা হয়ে আসলেন কিশোর দা। এলাকার দাদা। সিনেমার প্রডিউসার হিসেবে বেশ টাকা কামিয়েছেন, জানাশোনাও আছে তার। অভয় দিলেন আমাকে, জামাই বাবু, আপনি কালকেই আমার বোনকে নিয়ে চলে আসেন, আমি সিরিয়াল দিচ্ছি।
ঘাম দিয়ে জর ছাড়লো যেন!যথারীতি কিশোর দার কথামতো রওয়ানা দিলাম। এলিফ্যান্ট রোডের জ্যামে আটকা পড়েছি। কিশোর দা অনবরত ফোন দিয়ে যাচ্ছেন, জামাই বাবু, তাড়াতাড়ি আসেন;ডাক্তার বাবু চলেই যাচ্ছিলেন। আপনার কথা বলে দশ মিনিট আটকে রেখেছি। আমার কেমন খটকা লাগলো। এতোবড়ো চিকিৎসা বিজ্ঞানী আমার জন্য বসে আছেন?
বউ এর কাছে নিজের ইজ্জত আরেকটু বেড়ে গেলো যেন!
ক্লিনিকে গিয়ে দেখি সত্যি সত্যিই উনি আমাদের জন্য বসে আছেন। রোগী দেখা শুরু হলো। গলার ভিতর যন্ত্র লাগিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, উনি কি গান করেন?
আমি বললাম, হ্যাঁ, প্রতিদিনই তো ভৈরবী রাগে শুরু হয় আর ইমন দিয়ে শেষ হয়। বউ আবার গোঁ গোঁ করে উঠলো। গলায় যন্ত্রের কারনে কথা বলতে পারেনা। মনে হলো বলতে চাইছে, আগে বাড়ি চল, তোর দেখাচ্ছি!এবার ডাক্তার বাবু রোগীর চেয়ে আমার দিকেই বেশি তাকাচ্ছেন। শেষে আমাকে প্রসংশা করেই বলে ফেললেন, বাহ এতো কম বয়সে উচ্চ আদালতের বিচারপতি হয়েছেন দেখে ভালো লাগছে।
-স্যরি স্যার, আমি তো যুগ্ম জেলা জজ। অধস্তন আদালতের বিচারক। ডাক্তার বাবু এবার থামলেন, =আপনার এটেন্ডেন্টকে একটু ডাকবেন প্লিজ?
আমি কিশোর দাকে ফোন দিয়ে ভিতরে যেতে বলতেই তিনি বললেন, জামাই বাবু, আমি বসুন্ধরা শপিং মলের সাইডে এক পানের দোকানে বসে আছি। বোনের দেখা হলে চলে যান। আমি আসবো না। বলেই ফোন বন্ধ করে দিলেন।
পরের দিন দেখা হলে আমাকে তিনি বলেই দিলেন, আমি ভুল পরিচয় দেবার জন্য খুবই লজ্জিত। কিন্তু আমি সেটা না বললে ডাক্তার বাবুকে থামাতে পারতামনা। সেদিনের সেই লজ্জাজনক ঘটনা এখনো আমাকে পিড়া দেয়।
তবে মনে মনে খুশিও লাগে। মৌসুমী সেই চিকিৎসার পরেই ভালো হয়ে যায়।
দাগ? তো কি হয়েছে?
দাগ থেকে যদি নতুন কিছু হয়, তো দাগই ভালো! স্ত্রীর প্রসংশা করার দিনে এর চাইতে বেশি আলোকিত করার ক্ষমতা কোন ডেকোরেটরেরও নাই আমি দিব্যি দিয়ে বলতে পারি। পৃথিবীর সকল স্ত্রীই সুখী হোক; আর স্বামীরা মূক ও বধির।

লেখক: মুহা. হাসানুজ্জামান
বিচারক (জেলা জজ)
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল, রাজশাহী।