লেখক: প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রধানত তিনটি মাধ্যমে রোগী ভর্তি করা হয়। যথা:-জরুরী বিভাগ, বহি:বিভাগ এবং রেফারেল ব্যবস্থা।জরুরি বিভাগ (Emergency Department): তীব্র অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক বা জীবনশঙ্কাজনক অবস্থায় রোগীরা সরাসরি এখানে আসেন। এই বিভাগটি ২৪ ঘণ্টা সেবা প্রদান করে।বহিঃবিভাগ (Outpatient Department – OPD): সাধারণ বা দীর্ঘমেয়াদী রোগের জন্য রোগীরা সকালের শিফটে টিকিট কেটে নির্দিষ্ট বিভাগের (যেমন: মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, শিশু) চিকিৎসক দেখান। মেডিকেল অফিসার যদি মনে করেন রোগীকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন, তবে তিনি ভর্তির জন্য ‘অ্যাডমিশন স্লিপ বা নির্দেশপত্র লিখে দেন।রেফারেল ব্যবস্থা (Referral System): অনেক সময় উপজেলা হাসপাতাল বা বেসরকারি ক্লিনিক থেকে জটিল রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বড় সরকারি হাসপাতালে (যেমন: মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে) স্থানান্তর করা হয়। এই রোগীরা সরাসরি সংশ্লিষ্ট ইনডোর বা ওয়ার্ডে ভর্তির সুযোগ পান।রোগী আগমন ও ভর্তির পরিসংখ্যানগত তারতম্য:সরকারি হাসপাতালগুলোতে জরুরি বিভাগ ও বহিঃবিভাগে রোগী আসার হারের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়েছে।বহিঃবিভাগ (OPD): প্রায় ৮০% থেকে ৮৫% রোগী আসে তন্মধ্যে মাত্র ৫% থেকে ১০% রোগী ভর্তি হয় এবং বাকিরা ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরে যান ।

জরুরি বিভাগ (Emergency) : মোট রোগীর ১৫% থেকে ২০% আসে এই বিভাগে। প্রায় ৪০% থেকে ৬০% রোগী অবস্থার জটিলতার কারণে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি হয়।

দুই বিভাগের মৃত্যুর হারের তুলনামূলক চিত্র:হাসপাতালের জরুরি বিভাগ এবং বহিঃবিভাগে আসা রোগীদের শারীরিক অবস্থার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত থাকে। স্বাভাবিকভাবেই, এই দুই বিভাগের মৃত্যুর হারেও একটি বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়।১. জরুরি বিভাগ (Emergency Department)এখানে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও সংকটাপন্ন রোগীরা আসায় মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। একে প্রধানত তিনটি ভাগে দেখা যায়:Brought Dead (হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যু): জরুরি বিভাগে নথিভুক্ত মৃত্যুর একটি বড় অংশই ঘটে হাসপাতালে আসার আগে। সড়ক দুর্ঘটনা, তীব্র হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা বিষপানের শিকার রোগীদের অনেকেই মৃত অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছান।প্রাথমিক চিকিৎসা ও ভর্তিকালীন মৃত্যু: জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা বা ভর্তির প্রক্রিয়া চলাকালীন মৃত্যুর হার সাধারণত ১% থেকে ৩%। তবে বড় মেডিকেল কলেজ বা ট্রমা সেন্টারগুলোতে জটিল রোগী বেশি আসায় এই হার কিছুটা বেশি হতে পারে।ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু: ওয়ার্ড বা ইনডোরে ভর্তির প্রথম ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি (৫% থেকে ৮%)। অর্গান ফেইলিওর বা তীব্র শক সামাল দেওয়ার জন্য এই প্রথম ২৪ ঘণ্টা রোগীর জীবনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়।২. বহিঃবিভাগ (Outdoor / OPD)এটি মূলত নিয়মিত পরামর্শ ও ওষুধ নেওয়ার জায়গা। এখানে মৃত্যুর হার নেই বললেই চলে।রোগীর ধরন: এখানে প্রধানত ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী (যেমন: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, চর্মরোগ বা সাধারণ সর্দি-কাশি) রোগীরা আসেন।ব্যবস্থাপনা: রোগীরা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে ডাক্তার দেখান। তীব্র সংকটাপন্ন কোনো রোগী সাধারণত বহিঃবিভাগের লাইনে দাঁড়ান না।জনঅসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দু: জরুরি বিভাগের মূল চ্যালেঞ্জসমূহ:আমার আজকের লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো জরুরি বিভাগ নিয়ে আলোচনা করা। এই বিভাগটি ঘিরেই প্রায়শই গণমাধ্যমে জনঅসন্তোষের খবর আসে। এমনকি রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের সাথে চিকিৎসকদের হাতাহাতি কিংবা মারামারির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটে থাকে। আমার নিজেরও কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে জরুরী বিভাগ নিয়ে। ২০১৪ সালে আমার বাবাকে নিয়ে জরুরী বিভাগে যাই কিন্তু সেখানে উপযুক্ত চিকিৎসক ছিলেন না। রোগীর সমস্যার কথা শুনে বহি:বিভাগের একজন চিকিৎসক ডিউটিরত নার্সকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। রোগীর ভীড়ে তিনি আসতে দেরি করায় আমার বাবা মারা যায়। হয়তোবা সঠিক সময়ে ডাক্তার আসলে বাবা বেঁচে যেত। বিষয়টি নিয়ে আমার আত্মীয় স্বজন কিছু কথা বলার চেষ্টা করলেও আমি কোনো কথা বলতে দেই নি।আবার ২০১৬ সালের দিকে আমার শ্বশুর হঠাৎ অসূস্থ হলে তাঁকে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে যাই। কর্তব্যরত চিকিৎসক একটি ইনজেকশন কিনে আনেতে বলেন। ইনজেকশনটি সংগ্রহ করতে দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে আর একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আসলে তিনি ইনজেকশনটি দেখে বলেন এ রোগীকে এই ইনজেকশন দেয়া মাত্র মারা যাবে। সে যাত্রায় আমার শ্বশুর বেঁচে যায়। আর একবার আমার এক সহকর্মীর স্বামী পৌর বাজারে হঠাৎ অসূস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলে তিনি ইশারা করেন তাঁকে বাসায় নিয়ে যাবার জন্য । তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসককে তিনি দেখাবেন । তাঁর ভাষায় জরুরী বিভাগ হলো মানুষ মারার কল। কারণ তাঁর অন্যান্য সমস্যাও আছে কাজেই একটি রোগ সারাতে যেয়ে অন্যগুলো মৃত্যুর কারণ হতে পারে।বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগ হলো স্বাস্থ্যসেবার সম্মুখ সমারোহ বা ‘ফ্রন্টলাইন’। তবে দেশের বিপুল জনসংখ্যা ও চাহিদার তুলনায় এই বিভাগগুলোকে প্রতিনিয়ত বেশ কিছু তীব্র লজিস্টিক এবং অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোকে নিচে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে আলোচনা করা হলো:১. অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা (Structural Constraints)স্থান সংকুলান ও ‘ওভারক্রাউডিং’: শয্যা বা ট্রলির সংখ্যার তুলনায় রোগীর চাপ বহুগুণ বেশি। ফলে অনেক সময় জরুরি বিভাগের মেঝেতে বা বারান্দায় রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হয়, যা জরুরি জীবন রক্ষাকারী কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায়।আধুনিক ‘ট্রায়াজ’ (Triage) ব্যবস্থার অনুপস্থিতি: উন্নত বিশ্বে জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের শারীরিক অবস্থার তীব্রতা অনুযায়ী (যেমন: লাল, হলুদ, সবুজ জোনে) ভাগ করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ হাসপাতালে স্থান এবং সুনির্দিষ্ট নকশার অভাবে এই বৈজ্ঞানিক ট্রায়াজ ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয় না। ফলে সর্দি-কাশি বা সাধারণ কাটার রোগী এবং হার্ট অ্যাটাকের রোগী একই লাইনে দাঁড়িয়ে যান।নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (ICU/CCU) অপ্রতুলতা: জরুরি বিভাগে একজন রোগীকে স্থিতিশীল (Stabilize) করার পর যদি তার লাইফ সাপোর্ট বা নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, তবে প্রায়ই হাসপাতালে খালি বেড পাওয়া যায় না। এই ব্যাকলগের কারণে জরুরি বিভাগেই রোগীকে দীর্ঘ সময় সংকটাপন্ন অবস্থায় আটকে থাকতে হয়।২. লজিস্টিক ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি (Logistical & Equipment Shortages)পয়েন্ট-অফ-কেয়ার টেস্টিং (POCT) সুবিধার অভাব: জরুরি বিভাগে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের জন্য ইসিজি (ECG), ট্রপোনিন-আই (Troponin-I), রক্তের গ্যাস বিশ্লেষণ (ABG) বা পোর্টেবল এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম সুবিধাসার্বক্ষণিক থাকা প্রয়োজন। অনেক জেলা বা উপজেলা হাসপাতালে এই পরীক্ষাগুলোর জন্য রোগীকে মূল ল্যাবে পাঠাতে হয়, যা মূল্যবান সময় নষ্ট করে।লাইফ-সেভিং ড্রাগ ও সরঞ্জামের সংকট: সরকারিভাবে জরুরি ওষুধ সরবরাহ করা হলেও অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে অনেক সময় কিছু অতি প্রয়োজনীয় ইনজেকশন বা ডিভাইস (যেমন: ডিফিব্রিলেটর বা ভেন্টিলেটর মাস্ক) দ্রুত হাতের কাছে পাওয়া যায় না।পরিবহন ও প্রি-হসপিটাল কেয়ারের সমন্বয়হীনতা: উন্নত মানের সেন্ট্রালাইজড অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস বা প্রি-হসপিটাল কেয়ারের (হাসপাতালে পৌঁছানোর আগের প্রাথমিক চিকিৎসা) মারাত্মক অভাব রয়েছে। ফলে রোগী যখন জরুরি বিভাগে পৌঁছান, ততক্ষণে তার অবস্থার অনেকটাই অবনতি ঘটে।৩. মানবসম্পদ ও জনবল সংকট (Human Resource Deficit)ডেডিকেটেড ‘ইমার্জেন্সি মেডিসিন’ বিশেষজ্ঞের অভাব: বাংলাদেশে ‘ইমার্জেন্সি মেডিসিন’ (Emergency Medicine) একটি স্বতন্ত্র এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা শাখা হিসেবে এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। সাধারণত মেডিকেল অফিসার বা ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দিয়ে এই বিভাগ চালানো হয়, যাদের ট্রমা বা তীব্র ক্রিটিক্যাল কেয়ারের ওপর দীর্ঘমেয়াদী বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ থাকে না।নার্স ও সাপোর্টিং স্টাফের বৈষম্যমূলক অনুপাত:* রোগীর সংখ্যার অনুপাতে নার্স, ওয়ার্ডবয় এবং ট্রলিবাহকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। সংকটাপন্ন রোগীকে এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নেওয়ার জন্য জনবলের ঘাটতি একটি বড় লজিস্টিক সমস্যা।৪. নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা (Security & Administrative Management)বহিরাগত ও দালালের দৌরাত্ম্য: জরুরি বিভাগের প্রবেশমুখে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত সিকিউরিটি বা সিসিটিভি নজরদারির অভাব থাকে। এতে ট্রলি পাওয়া থেকে শুরু করে সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার দালাল চক্রের কারণে তীব্র বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।অ্যাটেনডেন্ট সিন্ড্রোম (Attendant Syndrome): একজন সংকটাপন্ন রোগীর সাথে ৫ থেকে ১০ জন স্বজন জরুরি বিভাগে ঢুকে পড়েন। এতে চিকিৎসকদের কাজ করার জায়গা সংকুচিত হয়, মনোযোগ ব্যাহত হয় এবং একই সাথে হাসপাতালে জীবাণু সংক্রমণের (Cross-contamination) ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।গোল্ডেন টাইম ও জরুরী বিভাগের করণীয়:চিকিৎসা ক্ষেত্রে ‘গোল্ডেন টাইম’ হলো তীব্র আঘাত, স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্য সংকটের পরবর্তী প্রথম এক ঘণ্টা বা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সুনির্দিষ্ট সময়কাল, যা জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান নির্ধারণ করে। এই মূল্যবান সময়ে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা দিলে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়ে এবং স্থায়ী পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কমে। স্ট্রোকের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৪.৫ ঘণ্টা (Time is Brain) এবং হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রথম ১ থেকে ২ ঘণ্টার মধ্যে (Time is Muscle) রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে পারলে মস্তিষ্ক ও হৃদপেশির স্থায়ী ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।এই জীবনরক্ষাকারী সময়টুকু সফলভাবে কাজে লাগাতে হাসপাতালের জরুরী বিভাগকে গতি ও সমন্বিত সিদ্ধান্তের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। রোগী আসামাত্রই দ্রুত ‘ট্রায়াজ’ পদ্ধতির মাধ্যমে সংকট চিহ্নিত করে আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই সরাসরি জরুরি কক্ষে নিতে হবে এবং শ্বাসনালী, শ্বাস-প্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন (A-B-C) সচল করার প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে জরুরী বিভাগেই ইসিজি বা পোর্টেবল এক্স-রে’র মতো তাৎক্ষণিক পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা এবং ‘কোড স্ট্রোক’ সক্রিয় করে দ্রুততম সময়ে (ডোর-টু-নিডল/বেলুন টাইম কমিয়ে) হৃদপিণ্ড বা মস্তিষ্কের রক্তনালীর ব্লক খোলার চূড়ান্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করাই জরুরী বিভাগের মূল দায়িত্ব।লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।