লেখক: প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন

ধর্ষণ একটি জঘন্য সামাজিক ব্যাধি, যা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার গত ১০ বছরের উপাত্ত অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর গড়ে ১,০০০ থেকে ১,৫০০টিরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। অথচ উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলায় চূড়ান্ত সাজার হার মাত্র ৩% থেকে ৪%। জাতিসংঘের ভাষায়, “Violence against women is one of the most pervasive human rights violations in the world.” বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও UNFPA-এর জরিপ অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় সহিংসতার শিকার হন। সাধারণ মানুষের ধারণা, অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়া এবং এই অতি নিম্ন সাজার হারের কারণেই অপরাধ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে; তাই অনেকে মধ্যপ্রাচ্যের মতো প্রকাশ্য বা কঠোর শাস্তির দাবি তুলছেন। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে—শুধু কঠোর আইনই কি একমাত্র পথ, নাকি এর পেছনে আরও গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে?
কিটি জেনোভিস হত্যাকাণ্ড ও ‘বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট’
অপরাধবিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত এবং শিক্ষণীয় একটি বাস্তব ঘটনা হলো ১৯৬৪ সালের ‘কিটি জেনোভিস হত্যাকাণ্ড’। এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডই নয়, বরং মানব সভ্যতার জন্য একটি গভীর সামাজিক ক্ষত এবং মনস্তাত্ত্বিক দর্শন।
১৯৬৪ সালের ১৩ মার্চ, গভীর রাত। নিউইয়র্কের এক আবাসিক এলাকায় ২৮ বছরের তরুণী কিটি জেনোভিসকে ছুরিকাঘাত ও পাশবিক নির্যাতন করছিল এক নরপিশাচ। দীর্ঘ ৩০-৩৫ মিনিট ধরে চলা এই নারকীয় তাণ্ডবের সময় কিটি বাঁচার জন্য চিৎকার করেছিলেন—”ওহ ঈশ্বর! ও আমাকে মেরে ফেলল! আমাকে বাঁচাও!” নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলাকার অন্তত ৩৮ জন মানুষ নিজেদের জানালা দিয়ে এই নৃশংসতা দেখেছিলেন বা আর্তচিৎকার শুনেছিলেন। কিন্তু কেউ পুলিশকে ফোন করেননি, কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি। এমনকি আক্রমণকারী একবার আলো দেখে পালিয়ে গিয়েও যখন দেখল কেউ আসছে না, তখন ফিরে এসে অপরাধ সম্পন্ন করে। যখন একজন পুলিশ ডাকলেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই কিটি মারা যান।
এই নির্মম নির্লিপ্ততা পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কেন ৩৮ জন মানুষ চোখের সামনে একটি মেয়েকে মরতে দেখেও চুপ থাকলেন? এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে মনোবিজ্ঞানী জন ডার্লি এবং বিব লাতানে আবিষ্কার করেন সমাজবিজ্ঞানের এক বিখ্যাত তত্ত্ব—”বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট” (Bystander Effect) বা দর্শকের নিষ্ক্রিয়তার কুফল। এই ট্র্যাজেডি থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ৩টি বাস্তব শিক্ষা পাওয়া যায়:
১. দায়িত্বের বিস্তারণ (Diffusion of Responsibility): ভিড়ের মধ্যে সবাই মনে করে, “আশপাশে তো আরও অনেক মানুষ আছে, কেউ না কেউ নিশ্চয়ই পুলিশকে জানাবে বা বাঁচাবে।” এই ‘দায়িত্ব ভাগাভাগি’র মানসিকতার কারণে প্রত্যেকে নিষ্ক্রিয় বসে থাকে এবং অপরাধী অনায়াসে পার পেয়ে যায়।
২. প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস: মানুষ ভিড়ের মধ্যে অন্যের প্রতিক্রিয়া দেখে নিজের আচরণ ঠিক করে। সবাই চুপ থাকলে বাকিরা ভাবে—”কেউ যখন এগিয়ে আসছে না, তাহলে আমি কেন?” তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অন্যের উদ্যোগের অপেক্ষা না করে প্রথম প্রতিবাদটি নিজেকেই করতে হবে।
৩. ভিকটিম ব্লেমিং বা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার মানসিকতা দূর করা: সমাজ প্রায়ই অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগী কেন রাতে বাইরে ছিল বা কী পোশাক পরেছিল—তা নিয়ে মেতে ওঠে। কিটির ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধীর উদ্দেশ্য শুধুই অপরাধ করা। সমাজের দায়িত্ব ভুক্তভোগীর চরিত্রহনন না করে, অপরাধীর দিকে আঙুল তোলা এবং ভুক্তভোগীকে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দেওয়া। অন্যথায় অপরাধীর ওপর থেকে সামাজিক মনোযোগ সরে যায় এবং সে এক ধরণের ছাড় পেয়ে যায়।
ধর্ষণের মতো অপরাধ কেবল একজন অপরাধীর বিকৃত মানসিকতার ফসল নয়, বরং এটি সমাজের সেইসব মানুষের নীরবতার সুযোগেও ঘটে যারা দেখেও না দেখার ভান করে। এই ঘটনার পরই মার্কিন প্রশাসন বুঝতে পারে যে জরুরি মুহূর্তে পুলিশের সাথে যোগাযোগের সহজ কোনো মাধ্যম ছিল না। ফলে ১৯৬৮ সালে আমেরিকায় সমন্বিত জরুরি নম্বর ‘৯১১’ চালু করা হয়।
বিচারহীনতার সংস্কৃতির সামাজিক কুফল।
আমাদের দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩% থেকে ৪% এবং একটি মামলার রায় হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণে প্রায় ৯৬% অপরাধীই খালাস পেয়ে যায়, যা সমাজে একটি স্থায়ী বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে নতুন অপরাধীদের উৎসাহিত করে।
কোনো এলাকায় একটি ধর্ষণের ঘটনার বিচার না হলে, আশেপাশের শত শত পরিবার আতঙ্কে মেয়েদের একা স্কুলে, কলেজে বা কর্মক্ষেত্রে পাঠানো বন্ধ করে দেয়, যার সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে দেশের শিক্ষা ও অর্থনীতির ওপর। তাছাড়া অপরাধীর শাস্তি না হলে সাধারণ মানুষও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়ে ফেলে। রাস্তার মোড়ে বা পাবলিক বাসে কোনো নারী হেনস্থার শিকার হলে সাধারণ মানুষ ভাবেন, “প্রতিবাদ করলে অপরাধী চক্র উল্টো আমার ক্ষতি করবে, পুলিশ বা আইন তো আমাকে রক্ষা করবে না।” এই ভয় সমাজকে এক ধরনের সংবেদনহীন “নীরব দর্শক”-এ পরিণত করে।
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বা বিচারে কেউ হস্তক্ষেপ করবে না। আইন সবার জন্য সমানভাবে কাজ করবে। কিন্তু কোন কারণে যখন জনগণ দেখে যে কেবল চাপ সৃষ্টি করলেই দ্রুত বিচার পাওয়া যায়, তখন তারা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। যার ফলে গণপিটুনি বা ‘মব জাস্টিস’ (Mob Justice)-এর মতো ঘটনা ঘটে। যখন একটি মামলার রায় দ্রুত সময়ে দেয়া হয় আর শত শত সমগোত্রীয় মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তখন ন্যায়বিচারের সমতার নীতি লঙ্ঘিত হয়।
আপনার বক্তব্যের সাথে একমত হয়ে বলা যায়, জনমতের চাপ সামলাতে গিয়ে “শর্টকাট” বা তাৎক্ষণিক উপশমের পথ বেছে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ক্ষতি করে। ন্যায়বিচার তখনই সার্থক হয়, যখন তা প্রচারের আলোয় থাকা মামলা এবং প্রচারের আড়ালে থাকা সাধারণ মানুষের মামলা—উভয় ক্ষেত্রেই সমান গতিতে ও নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়িত হয়।
কঠোর আইন বনাম শাস্তির নিশ্চয়তা: বৈশ্বিক পরিসংখ্যান।
আইনের প্রয়োগ কঠোর (যেমন মৃত্যুদণ্ড) করলেই যে ধর্ষণ কমবে, আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান তা সমর্থন করে না। যুক্তরাজ্যে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আইন অত্যন্ত কঠোর হওয়া সত্ত্বেও সেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার ধর্ষণের অভিযোগ জমা পড়ে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের অফিশিয়াল ডাটা অনুযায়ী, সেখানে মামলা থেকে চূড়ান্ত সাজার হার (Conviction Rate) মাত্র ১.৫% থেকে ২%-এর কাছাকাছি। ফলে সাজার নিম্ন হারের কারণে সেখানে অপরাধের প্রবণতা আশানুরূপ কমছে না।
আবার সৌদি আরব, মিশর বা ইরান—যেসব দেশে ধর্ষণের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর (প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড বা চাবুক), সেখানে জাতিসংঘের ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম অফিসের (UNODC) সরকারি পরিসংখ্যানে ধর্ষণের হার প্রতি ১ লাখে মাত্র ০.১ থেকে ০.৭ জনের মতো দেখায়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, কঠোর আইনের কারণে সেখানে অপরাধ কমছে—এটি আংশিক সত্য। এর মূল কারণ হলো, সেসব সমাজ ও আইনি কাঠামোতে ভুক্তভোগী নারী যদি শতভাগ প্রমাণ করতে না পারেন যে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়েছে, তবে উল্টো তার নিজেরই ‘ব্যভিচার’ বা ‘অবৈধ সম্পর্কের’ দায়ে কঠিন শাস্তি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই প্রচণ্ড ভয়ের কারণে প্রায় ৯৮% ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায় এবং নারীরা থানায় অভিযোগই দায়ের করেন না।
একটি তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোটামুটি কঠোর সাজার দেশ দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে তদন্তের সময় লাগে ৩-৭ বছর এবং আইনি দীর্ঘসূত্রিতা ও ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের কারণে চূড়ান্ত সাজার হার মাত্র ৩% থেকে ৫%। অন্যদিকে, আধুনিক বিচার ব্যবস্থার দেশ যেমন—নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ও উন্নত দেশে তদন্তের সময় গড়ে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস, যার ফলে বিচারের রায় দ্রুত হয় এবং নিশ্চিত সাজার হার ৩০% থেকে ৫০%।
অপরাধবিজ্ঞানের মূল সূত্র মতে—১০ জন ধর্ষকের মধ্যে ১ জনকে ১০ বছর পর ফাঁসি দেওয়ার চেয়ে, ১০ জন ধর্ষকের প্রত্যেককে যদি অপরাধের ৩ মাসের মধ্যে নিশ্চিতভাবে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যায়, তবেই অপরাধ দ্রুত কমে আসবে। অপরাধী ফাঁসিকে ততটা ভয় পায় না, অপরাধী সবচেয়ে বেশি ভয় পায়—”ধরা পড়লে পার পাওয়া অসম্ভব”, এই বাস্তবতাকে।
কঠোর শাস্তি যেভাবে মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করে: স্নায়বিক বিশ্লেষণ।
কঠোর শাস্তির দৃষ্টান্ত বা তা প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা একজন মানুষকে অপরাধ থেকে বায়োলজিক্যালি (Biologically) এবং নিউরোলজিক্যালি (Neurologically) দূরে সরিয়ে রাখতে গভীর প্রভাব ফেলে। এই প্রক্রিয়াটি মূলত কয়েকটি ধাপে কাজ করে:
১. ভয়ের স্থায়ী ছাপ ও হরমোনের প্রভাব (Fear Conditioning): শাস্তির মুখোমুখি হলে বা শাস্তির তীব্রতা দেখলে মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ (Amygdala) অংশটি তীব্রভাবে সক্রিয় হয় এবং মস্তিষ্কে একটি স্থায়ী ভয়ের ছাপ তৈরি করে। পরবর্তীতে অপরাধের চিন্তা করলেই অ্যামিগডালা শরীরে ভয়ের সংকেত পাঠায়। শাস্তির ভয়ে শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে, যা এমন একটি শারীরিক অস্বস্তি বা ট্রমা তৈরি করে, যা মানুষ বায়োলজিক্যালি এড়াতে চায়।
২. পুরস্কারের আনন্দ হ্রাস (Reward Pathway): মানুষ সাধারণত ডোপামিন হরমোনের প্রভাবে আনন্দের আশায় কাজ করে। কিন্তু কঠোর ও নিশ্চিত শাস্তির ভয় মস্তিষ্কের এই ‘পুরষ্কার পাওয়ার আনন্দ’ বা Reward Pathway-কে স্তিমিত করে দেয়। ফলে অপরাধের চিন্তার সাথে আনন্দের বদলে কষ্টের সংযোগ তৈরি হওয়ায় ডোপামিনের তাড়না কমে যায়।
৩. মস্তিষ্কের যৌক্তিক অংশের নিয়ন্ত্রণ (Executive Inhibition): নিউরো-ল (Neurolaw) গবেষণা অনুযায়ী, অপরাধের সিদ্ধান্ত মূলত মস্তিষ্কের দুটি অংশের দ্বন্দ্বের ওপর নির্ভর করে—’অ্যামিগডালা’ (যা লোভ, রাগ বা অপরাধের তাৎক্ষণিক আবেগকে উসকে দেয়) এবং ‘ডরসোলেটারাল প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ (যা বিচারবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে)। কঠোর ও নিশ্চিত আইনের সমাজে শাস্তির অনিবার্যতা দেখে মস্তিষ্কে সতর্কতার একটি স্থায়ী স্নায়বিক অভ্যাস তৈরি হয়। ফলে কেউ অপরাধের কথা চিন্তা করলে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সম্ভাব্য শাস্তি ও সামাজিক অপমানের হিসাব কষে অ্যামিগডালার আদিম বা অপরাধপ্রবণ আবেগকে দমন করে।
৪. দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন (Epigenetics & Neuroplasticity): তীব্র ও নিশ্চিত সামাজিক নিয়মের প্রভাব মানুষের জিনের প্রকাশে পরিবর্তন আনতে পারে (এপিজেনেটিক্স), যা আচরণে দীর্ঘমেয়াদী সতর্কতা তৈরি করে। এমনকি এর ফলে মস্তিষ্কের নিউরনের মধ্যকার সংযোগেরও পুনর্গঠন ঘটে (নিউরোপ্লাসিটিসিটি), যা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের প্রতি মানুষের মানসিক আগ্রহ কমিয়ে দেয়। সিঙ্গাপুর বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অপরাধের হার কম হওয়ার কারণ জন্মগত নয়, বরং কঠোর আইন ও নিশ্চিত শাস্তির ফলে সৃষ্ট গভীর মনস্তাত্ত্বিক কন্ডিশনিং। সহজ কথায়, “অপরাধ করলে রক্ষা নেই”—এই সামাজিক বাস্তবতাই মানুষের যৌক্তিক মস্তিষ্ককে দিয়ে অপরাধপ্রবণ আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করায়।
বিপরীতভাবে, অপরাধপ্রবণ পরিবেশ এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থা মানুষের মস্তিষ্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অপরাধ-স্নায়ুবিজ্ঞানের জনক অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান রেইনের (USC) এক গবেষণায় দেখা গেছে, চরম বিশৃঙ্খলা, দারিদ্র্য ও অভিভাবকহীন পরিবেশে বড় হওয়া শিশু-কিশোরদের মস্তিষ্কের গঠন বদলে যায়। সাধারণ মানুষের তুলনায় এদের মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যক্ষমতা এবং ধূসর পদার্থ (Gray Matter) ১১% থেকে ১৪% পর্যন্ত কম থাকে। এরকম পরিবেশে মানুষ বাস করলে তারা আইনের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল হয় এবং সহজেই অপরাধে জড়িয়ে যায়।
শেষ কথা:
ধর্ষণ প্রতিরোধে কেবল কঠোর আইন বা আইনের শিথিলতা কোনোটিই একক সমাধান নয়; বরং “দ্রুত বিচার ও শাস্তির নিশ্চিতকরণই” এই অপরাধ দমনের প্রধান ও একমাত্র কার্যকরী পথ। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায়, শাস্তির তীব্রতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা (Certainty of Punishment) অপরাধীকে বেশি অপরাধ থেকে দূরে রাখে।
ধর্ষণ কমানোর জন্য আমাদের নতুন কোনো কঠোর আইনের প্রয়োজন নেই, কারণ বর্তমান আইনেই মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এখন যা প্রয়োজন তা হলো—অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে উন্নত ডিএনএ (DNA) ফরেনসিক, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে অত্যন্ত দ্রুত ও নিখুঁতভাবে তদন্ত শেষ করা, যাতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে না থাকে।
আদালত ও পুলিশের আচরণ এমন হতে হবে যেন নারীরা নির্ভয়ে অভিযোগ করতে পারেন এবং ভুক্তভোগীকে আদালতে কোনো অপমানজনক বা আপত্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে না হয়। দ্রুত ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক তদন্তের মাধ্যমে ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করাই হবে আসল সমাধান। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক সুরক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিক শিক্ষা, জেন্ডার সমতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে হবে।
লেখক: অধ্যক্ষ (পিআরএল), কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।