ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি:
*হযরত ইউসুফ (আ.) যৌবনের পরীক্ষা দিলেন কারাগারে*
সুদর্শন, যৌবনপুষ্ট এক টগবগে যুবক এখন নবী ইউসুফ (আ.)। এখনো নবুয়তপ্রাপ্ত হননি। বয়স ২০ বা ৩০ হয়েছে। মন্ত্রীর স্ত্রী জুলাইখা। যে তাকে মায়ের স্নেহে বড় করেছে। সে নারীই তার প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করছে। কাছে পেতে চায় নির্জনে। একাকিত্বে। একান্ত নিজের করে। একদিনের ঘটনা। যার বর্ণনা কোরআনে এভাবে এসেছে।
যে মহিলাটির ঘরে সে ছিল সে তাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে থাকলো এবং একদিন সে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বললো, “চলে এসো।” ইউসুফ বললো, “আমি আল্লাহর আশ্রয় নিচ্ছি, আমার রব তো আমাকে ভালই মর্যাদা দিয়েছেন (আর আমি এ কাজ করবো!)। এ ধরনের জালেমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারে না।”
মহিলাটি তাঁর দিকে এগিয়ে এলো এবং ইউসুফও তার দিকে এগিয়ে যেতো যদি না তাঁর রবের জ্বলন্ত প্রমাণ প্রত্যক্ষ করতো। এমনটিই হলো, যাতে আমি তার থেকে অসৎবৃত্তি ও অশ্লীলতা দূর করে দিতে পারি। আসলে সে ছিল আমার নির্বাচিত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।(সুরা ইউসুফ : ২৩-২৪)।
ইউসুফ (আ.) ওই নারীর কুপ্রস্তাবে অসৎ কাজে লিপ্ত হতে রাজি হননি। অথচ ঘরটি ছিল সুরক্ষিত। নির্জন। নারীও স্বেচ্ছায় নিজেকে অর্পণ করছেন। জোর-জবরদস্তি নেই। কিন্তু ইউসুফ (আ.) আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে বন্ধ দরজার দিকেই দৌড় দিলেন। নিজের চরিত্রকে বাঁচানোর জন্য। পাপ থেকে বাঁচার জন্য। চরিত্র রক্ষার চেষ্টা করায় আল্লাহর ইশারায় বন্ধ দরজা অলৌকিকভাবে খুলে গেল, যা ছিল অকল্পনীয়। এ ঘটনা কোরআনে এভাবে এসেছে।
“শেষ পর্যন্ত ইউসুফ ও সে আগে-পিছে দরজার দিকে দৌড়ে গেলো এবং সে পেছন থেকে ইউসুফের জামা (টেনে ধরে) ছিঁড়ে ফেললো। উভয়েই দরজার ওপর তার স্বামীকে উপস্থিত পেলো। তাকে দেখতেই মহিলাটি বলতে লাগলো, “তোমার পরিবারের প্রতি যে অসৎ কামনা পোষণ করে তার কি শাস্তি হতে পারে? তাকে কারাগারে প্রেরণ করা অথবা কঠোর শাস্তি দেয়া ছাড়া আর কি শাস্তি দেয়া যেতে পারে?” (সুরা ইউসুফ : ২৫)।
*চরিত্র রক্ষায় বেছে নিলেন কারাজীবন*
আজিজ মিসরের কাছে তার স্ত্রী উল্টো অভিযোগ করল ইউসুফের বিরুদ্ধে। দাবি জানাল কঠিন শাস্তির। আর ইউসুফ তার নির্দোষ হওয়ার কৈফিয়ত পেশ করল। এক পর্যায়ে দোলনার শিশু সাক্ষ্য দিল, ইউসুফের জামা সামনের দিকে ছেঁড়া হলে ইউসুফ দোষী। আর পেছনের দিক ছেঁড়া হলে জুলাইখা দোষী। তদন্ত করে দেখা গেল ইউসুফের জামার পেছনের দিক ছেঁড়া। অর্থাৎ ইউসুফ নির্দোষ।
ইউসুফ-জুলাইখার এ ঘটনা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। নারীমহল থেকে নানান তিরস্কার আসে। জুলাইখাও পণ করে ইউসুফ তার চাহিদা পূরণ না করলে তাকে অবশ্যই কারারুদ্ধ করবে।
চরিত্র রক্ষা করা কঠিন হবে বুঝতে পেরে ইউসুফ (আ.) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। ‘হে প্রতিপালক! এই নারীরা আমাকে যে কাজের দিকে ডাকছে, তার চেয়ে কারাগারই আমার বেশি পছন্দ।’ (সুরা ইউসুফ : ৩৩)।
* *হযরত ইউনুস (আ.) কে যখন সমুদ্রের মাছ গিলে ফেলে তখন তিনি ছিলেন তরুণ।*
ইউনুস (আ) ইরাকের মুসল নগরীর মীনাওয়া জনপদে নবুয়াত লাভ করেন এবং নীনাওয়াবাসীদের দাওয়াত দিতে আদিষ্ট হন। দীর্ঘকাল দাওয়াত দেয়ার পরও তারা যখন ইমান আনল না তখন তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে নীনাওয়াবাসীর জন্য আযাবের দোয়া করেন এবং ঐ শহর ত্যাগ করেন। ভীত-সন্ত্রস্ত ফোরাত (ইউফ্রেটিস) নদীর তীরে পৌঁছার পর তিনি নৌকায় আরোহণ করেন। মাঝ নদীতে যাওয়ার পর নৌকা ঝড়ে আক্রান্ত হয়। সেই যুগের কুসংস্কার অনুযায়ী নৌকার আরোহীরা মনে করল, নিশ্চয়ই এই নৌকায় কোন পলাতক দাস আছে। এটা শুনে ইউনুস এর চৈতন্যদয় হলো যে, তিনি শহর ছাড়ার ব্যাপারে আল্লাহর অনুমতির অপেক্ষা করেননি। তিনি নিজের দোষ স্বীকার করলেন। নৌকার আরোহীরা তাঁর সততায় মুগ্ধ হল এবং তাঁকে নৌকা থেকে ফেলে দিতে সম্মত হল না। শেষ পর্যন্ত তারা লটারি করল এবং সেখানে ইউনুস এর নাম উঠল। ফলে বাধ্য হয়ে তারা ইউনুস কে নদীতে ফেলে দিল এবং ঐ সময়ে একটি বিরাট মাছ তাঁকে গিলে ফেলল। মাছের পেটের ভেতর অন্ধকারের মাঝে তিনি আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন। ফলে আল্লাহর আদেশে মাছটি তাঁকে নদীর তীরে এসে উগড়ে দিল। হযরত ইউসুফ (আ) এই পরীক্ষার সম্মুখীন যখন হন তখন তিনি ছিলেন একজন তরুণ বয়সের টগবগে যুবক।
*হযরত দাউদ (আ.) যখন জালিম শাসক জালুতকে হত্য করেন, তখন তিনিও তরুণই ছিলেন।*
হজরত দাউদ (আ.) নবী ও বাদশাহ ছিলেন। দাউদ (আ.) ছিলেন আল্লাহর প্রতি আস্থাশীল এক বিশ্বাসী সাধক এবং লৌহবর্ম নির্মাণের মাধ্যমে জীবিকা অর্জনকারী স্বনির্ভর/উদ্যোক্তা নবী। লোহা তাঁর হাতে নমনীয় হয়ে যেত। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অসম্ভব মিষ্টি। তাঁর পাঠ শুনে সবাই মুগ্ধ হতো। পাহাড়, তরুলতা, পশুপাখি এরাও তাঁর সঙ্গে উপাসনায় যোগ দিত। আল্লাহ পাহাড়-পর্বত ও পক্ষীকুলকে তাঁর প্রভাবাধীন করে দিয়েছিলেন।
আল্লাহ তায়ালা দাউদ (আ.)–কে বিপুল শক্তি ও ক্ষমতা দিয়েছিলেন। যুবক বয়স থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও বীর। খুব অল্প বয়সেই তিনি তালুতের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধে কুখ্যাত যুদ্ধবাজ জালুতকে হত্যা করেছিলেন। যা কোরআনে মহান আল্লাহ উল্লেখ করেছেন এভাবে-
“অবশেষে আল্লাহর হুকুমে তারা কাফেরদের পরাজিত করলো। আর দাউদ জালুতকে হত্যা করলো এবং আল্লাহ তাকে রাজ্য ও প্রজ্ঞা দান করলেন আর সেই সাথে যা যা তিনি চাইলেন তাকে শিখিয়ে দিলেন। এভাবে আল্লাহ যদি মানুষদের একটি দলের সাহায্যে আর একটি দলকে দমন না করতে থাকতেন, তাহলে পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা বিপর্যস্ত হতো। কিন্তু দুনিয়াবাসীদের ওপর আল্লাহর অপার করুণা (যে, তিনি এভাবে বিপর্যয় রোধের ব্যবস্থা করতেন)” । (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫১)
হজরত দাউদ (আ.)–কে আল্লাহ দিয়েছিলেন বীরত্ব, সাহসিকতা, খেলাফত, বিচারিক দক্ষতা ও পশুপাখির ভাষা বোঝার ক্ষমতা। হজরত দাউদ (আ.)-এর মতো সুমধুর সুর আর কাউকে দেওয়া হয়নি। হজরত দাউদ (আ.) যখন তাঁর মোহনীয় সুরে জাবুর পাঠ করতেন, তখন আকাশে উড়ন্ত পাখিও নীরবে দাঁড়িয়ে তিলাওয়াত শুনত। নদীর প্রবাহ থেমে যেত। বাতাসে সৃষ্টি হতো ভ্রমরের মতো গুনগুন গুঞ্জন।
যুদ্ধে বীরত্বের প্রমাণ দেওয়ার পর তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান। সেখানেও তিনি দক্ষতা ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর প্রজ্ঞার সুনাম কোরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
‘আমরা তার সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় করেছিলাম এবং তাঁকে দান করেছিলাম হিকমত এবং যোগ্যতা দিয়েছিলাম ফায়সালাকারী কথা বলার।’ (সোয়াদ, আয়াত: ২০)
ধারাবাহিক আলোচনা চলবে…..
