লেখক: অধ্যক্ষ শাহজালাল সবুজ:

*শাহ মুহাম্মাদ সুলতান রুমী (রহ.)*

১০৫৩ মোতাবেক হিজরী ৪৪৬ হিজরী সনে শাহ মুহাম্মাদ সুলতান রুমী রহ. প্রথমে চট্টগ্রামে আগমন করেন। অত:পর মেঘনা ও ব্রমপুত্র হয়ে বর্তমান নেত্রকোণার মদনপুরে কোচ রাজার রাজ্যে ইসলাম প্রচার করেন।

*আদম শহীদ (রহ.)*
খ্রিস্টীয় ১১১৯ সালে বিক্রমপুরে আদম নামক একজন মুবাল্লিগ এসেছিলেন। তখন এটি রাজা বল্লাল সেনের শাসনাধীন ছিল। রাজা বল্লাল সেন ইসলাম প্রচারে বাধা দেন। এতে মুসলমানদের সাথে তার যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে আদম শহীদ রহ. শাহাদাৎ বরণ করেন। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ দশকের শেষ দিকে শাহ মাখদুম রুপোস নামক একজন দাঈ রাজশাহী অঞ্চলে আসেন। তাঁর দাওয়াতেও বহুলোক ইসলাম গ্রহণ করেন।

*ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজী*

বঙ্গদেশ মুসলিম শাসনের স্থপতি ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজী। তিনি উত্তর আফগানিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন। ১১৯৩ সালে তিনি ভারতে আসেন। দিল্লীতে তখন কুতুবুদ্দীন আইবেকের শাসন ছিল। ১২০৪ সালে তারই প্রতিনিধি হিসেবে বখতিয়ার খিলজী বিহার ও বাংলা জয় করেন।

*হযরত শাহজালাল ইয়ামানী (রহ.)*

১৩০৩ সালে বিখ্যাত দা’ঈ হযরত শাহজালাল ইয়ামানী রহ. রণপ্রস্তুতি নিয়ে সিলেট আগমন করেন। তখন গৌরগোবিন্দ নামক একজন হিন্দু রাজা সিলেট শাসন করত। সে ছিল মুসলিম নির্যাতক। তখন লাখনৌতির শাসক-ছিল সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহ। তিনি সেনাপতি সিকান্দার গাজীর নেতৃত্বে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন গৌরগোবিন্দের বিরুদ্ধে। দুইবার হামলা চালিয়েও সিকান্দার গাজী তাকে পরাজিত করতে পারেননি। পরে অন্যতম সেনাপতি সাইয়েদ নাসিরুদ্দীন তাঁকে সহযোগিতা করেন। তদুপরি বিখ্যাত দা’ঈ হযরত শাহজালাল রহ. তাঁর তিনশত ষাট জন সাথী নিয়ে মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেন। আবারও সামরিক অভিযান পরিচালিত হয় গৌরগোবিন্দের বিরুদ্ধে। গৌরগোবিন্দ পরাজিত হয়ে জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায়। খ্রিস্টীয় ১৩০৩ সনে সিলেট লাখনৌতি রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়। সিলেট বিজয়ের পর হযরত শাহজালাল রহ. তাঁর সাথীদের নিয়ে সিলেট অঞ্চলে থেকে যান। তাঁর উন্নত চরিত্র মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে বাংলার হাজার হাজার হিন্দু-বৌদ্ধ ইসলাম গ্রহণ করেন।

*হযরত খানজাহান আলী (রহ.)*
হযরত খানজাহান আলী রহ. ছিলেন একজন ইসলাম প্রচারক এবং বাংলাদেশের বাগেরহাটের স্থানীয় শাসক। তিনি ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে তুঘলক সেনাবাহিনীতে সেনাপতির পদে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধান সেনাপতি পদে উন্নিত হন। ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি জৈনপুর প্রদেশের গভর্নর পদে যোগ দেন। পরবর্তীতে তাঁর নেতৃত্বে ৬০,০০০ হাজার অগ্রবর্তী সেনাদলসহ আরও দুই লক্ষ সৈন্য নিয়ে বাংলা আক্রমণ করেন। ফলে স্থানীয় শাসক রাজা গণেশ দিনাজপুরের ভাতুরিয়াতে আশ্রয় নেয়। ১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে খানজাহান আলী রহ. যশোরের বার বাজারে অবস্থান নেন এবং বাংলার দক্ষিণ পশ্চিম অংশে ইসলাম প্রচার করেন। সুলতান নাছির উদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে (১৫৩৪) তিনি বাগেরহাটে খলিফাবাদ রাজ্য গড়ে তোলেন। খানজাহান আলী বৈঠক করার জন্য একটি দরবার হল স্থাপন করেন। যা পরে ষাট গম্বুজ মসজিদ হয়। হযরত খানজাহান আলী রহ. বৃহত্তর যশোর ও খুলনা জেলার বিভিন্ন অংশে সর্বপ্রথম মুসলিম বসতি গড়ে তোলে ছিলেন। তিনি এই দুই জেলায় কয়েকটি শহর প্রতিষ্ঠা, মসজিদ, মাদরাসা, সরাইখানা, মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ এবং বহু সংখ্যক দিঘি খনন করেন। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যকীর্তি বর্তমান বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ।

*আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ*
১৫১৬ খ্রি. আলাউদ্দিন হুসাইন শাহের শাসনকালে চট্টগ্রাম বাংলা সালতানাতের অধীনে আসে এবং দারুল ইসলামে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে মুঘল-আফগান দ্বন্দে¦র সময় আরাকানের রাজা চট্টগ্রাম দখল করে নেন। তখন থেকে চট্টগ্রাম মগ ও পর্তুগীজদের লুণ্ঠন ভূমিতে পরিণত হয়। খ্রিস্টীয় ১৬৬৬ সনের ২৭ শে জানুয়ারি সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে শায়েস্তা খাঁ’র ছেলে উমেদ খাঁ চট্টগ্রাম বিজয় করেন। চট্টগ্রাম বিজয়ের খবর দিল্লীতে পৌছলে আওরঙ্গজেব এর নাম রাখেন ইসলামাবাদ। চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মারক হিসেবে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে এখানে নির্মাণ করেন আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ।

*হাজী শরীয়ত উল্লাহ*
হাজী শরীয়ত উল্লাহ ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে বর্তমানে মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার বাহাদুরপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৮ বছর বয়সে হজ্ব করতে গিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর আরব দেশে অবস্থান করে শরীয়তের বিভিন্ন বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। ১৮১৮ সালে দেশে ফিরে বাংলাদেশের মানুষের হিদায়াতের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে ইসলামী আদর্শের পূর্ণ বাস্তবায়ন, নির্যাতিত মানুষের মাঝে রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত করণ , পরাধীনতার শৃংক্সখল থেকে মুসলমানদের মুক্ত করণই ছিল তাঁর মিশনের মূল উদ্দেশ্য। ইসলামের যে সকল ফরজ বিধান মানুষ ছেড়ে দিয়েছিল সেগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে তিনি অধিক গুরুত্বারোপ করতেন। এজন্য তাঁর আন্দোলন ফরায়েজী আন্দোলন নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। তাঁর অব্যাহত কর্মতৎপরতার ফলে সারা দেশের মুসলমানদের মাঝে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়। ১৮৪০ সালে এই সমাজ সংস্কারক মর্দে মুজাহিদ ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র পুত্র মুহসীন উদ্দিন (দুদু মিয়া) এই আন্দোলনের নেতৃত্বের ভার গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্ব গ্রহণের পর ফরায়েজী আন্দোলনে নতুন গতির সঞ্চার হয়। ইংরেজদের মদদপুষ্ট হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার থেকে মুসলমান কৃষকদের রক্ষা করার জন্য তিনি বিশাল লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তোলেন। ১৮৪১ ও ১৮৪২ সালে তিনি কানাইপুর ও ফরিদপুরের জমিদারদের বিরুদ্ধে দুটি যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন।

*শহীদ তিতুমীর (রহ.)*
উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সিপাহসালার সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহ.) এর আন্দোলনের বঙ্গদেশীয় অঞ্চলের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন শহীদ তিতুমীর (রহ.)। জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও নারিকেল বাড়িয়ায় তাঁর ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লার জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। ১৭৮২ সালে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলায় শহীদ তিতুমীরের জন্ম হয়। ১৮২২ সালে তিনি মক্কায় হজ্ব করতে যান। সেখানে তিনি স্বাধীনতার অন্যতম পথপ্রদর্শক সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ (রহ.) এর কাছ থেকে জিহাদী চেতনার দীক্ষা গ্রহন করেন। ১৮২৭ সালে তিনি দেশে ফিরে এসে জনগনকে স্বাধীনতার পক্ষে উজ্জীবিত করতে থাকেন। মুসলমানদের ঈমান ও আমলের হিফাজতের জন্য একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা তিনি তীব্রভাবে অনুভব করেন। দলে দলে লোক তাঁর এই চেতনাকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হয়। একসময় তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ৫০০০ গিয়ে পৌছে। তারা সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়।

*শহীদ আব্দুল মালেক ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রসেনানী-*

পাকিস্তান আমলে সর্বশেষ শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয় ১৯৬৯ সালে । এতে শিক্ষা ব্যবস্থার আদর্শিক ভিত্তি কি হবে, তা নিয়ে জনমত জরিপের আয়োজন করা হয় । এর অংশ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৬৯ সালের ১২ আগষ্ট টি.এস.সি তে আয়োজন করা হয় একটি আলোচনা সভার । এই আলোচনা সভায় বামপন্থীদের বিরোধীতামুলক বক্তব্যের মধ্যে শহীদ আব্দুল মালেক মাত্র ৫ মিনিট বক্তব্য রাখার সুযোগ পান । অসাধারন মেধাবী বাগ্মী আব্দুল মালেকের সেই ৫ মিনিটের যৌক্তিক বক্তব্যে সভার মোটিভ পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়ে যায় । উপস্থিত শ্রোতারা আব্দুল মালেকের বক্তব্যের সাথে ঐক্যমত্য পোষণ করে । আব্দুল মালেকের তাত্ত্বিক ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য স্তব্ধ করে দেয় ইতিপূর্বে বক্তব্য রাখা ইসলাম বিরোধী বক্তাদের । এই ঘটনার প্রেক্ষিতে যুক্তি ও বাস্তবতার লড়াইয়ে পরাজিত বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী ক্ষিপ্ত হয়ে তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ খান মেনন গংদের নেতৃত্বে আক্রমন চালায় ছাত্রদের ওপর । সকল সংগীকে নিরাপদে বিদায় দিয়ে শহীদ আব্দুল মালেক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশ দিয়ে যাবার পথে লোহার রড-হকিষ্টিক নিয়ে তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে পিশাচ বাহিনী ধর্মনিরপেক্ষ ও বাম সন্ত্রাসীরা । রক্তাক্ত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রাণ রসায়ন বিভাগের অন্যতম সেরা মেধাবী ছাত্র আব্দুল মালেক । তিন দিন পর ১৫ আগষ্টে শাহাদাত বরন করেন ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের এই মহান যুবক ।
এরপর থেকে এ দিন টিকে ইসলামী শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

 

ধারাবাহিক আলোচনা চলবে…..