ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি:  ইবাদত, শিক্ষা ও আনন্দের এক সম্মিলিত যাত্রা: কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে নবনির্মিত ছাত্রীদের নামাজ ঘর, স্থায়ী ব্যাডমিন্টন কোর্ট ও নবসজ্জিত অডিটোরিয়ামসমূহের শুভ উদ্বোধন করেন কলেজের সম্মানিত অধ্যক্ষ প্রফেসর কাজী শফিকুর রহমান

সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার।

কুড়িগ্রাম জেলা সদরে জন্ম হলেও কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের সঙ্গে আমার প্রকৃত পথচলা শুরু হয় ২৮ নভেম্বর ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে। মাত্র প্রায় ১৩ মাসের এই সময়টুকু আমার কাছে কখনোই শুধু একটি চাকরির সময়কাল মনে হয়নি। যোগদানের প্রথম দিন থেকেই অনুভব করেছি, এটি কেবল একটি কর্মস্থল নয়, বরং একটি দায়িত্ব, একটি আমানত। সেই আমানতের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই প্রতিটি কাজ করার চেষ্টা করেছি।

কর্মজীবনের অন্তিম প্রান্তে এই কলেজে যোগদানের পর যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি ব্যথিত করেছে, তা হলো ছাত্রীদের জন্য আলাদা কোনো নামাজ ঘরের ব্যবস্থা না থাকা। বাস্তবতা ছিল রুমের স্বল্পতা, সীমাবদ্ধ অবকাঠামো। তবুও হাল ছাড়িনি। নতুন বিজ্ঞান ভবন জুন মাসে হস্তান্তরের কথা থাকলেও দীর্ঘ অপেক্ষার পর নভেম্বরের শেষ দিকে সেটি আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রসায়ন বিভাগ নতুন ভবনে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হলে ডিসেম্বরের ছুটির মধ্যেই ছাত্রীদের কমনরুম স্থানান্তরিত এবং তার সাথে নামাজ ঘরের একটি সুন্দর, স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়। এই কাজটি সম্পন্ন করতে পারা ছিল অন্তরের এক গভীর শান্তি, এক ধরনের আত্মিক তৃপ্তি।

এই নামাজ ঘর প্রতিষ্ঠার কাজটি হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এর আগেও কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে কর্মরত অবস্থায় উক্ত কলেজের জামে মসজিদের উত্তর পাশে আহবায়ক হিসেবে মসজিদের উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত থাকার সুযোগ হয়েছিল। পরবর্তীতে লালমনিহাট সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে ছাত্রীদের জন্য প্রথমবারের মতো একটি নামাজ ঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করি। একইভাবে নাগেশ্বরী সরকারি কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে পুরুষদের নামাজ ঘরের উন্নয়ন এবং ছাত্রীদের জন্য আলাদা নামাজ ঘর প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

এই সকল কাজই সম্পন্ন হয়েছে সম্পূর্ণভাবে কলেজের নিজস্ব অর্থায়নে। কোনো প্রকল্পের বরাদ্দ কিংবা কোনো বিশেষ তহবিলের সহায়তা ছিল না। ছিল কেবল বিশ্বাস, সদিচ্ছা এবং মহান আল্লাহ তাআলার ওপর পূর্ণ ভরসা।

এই কলেজে একটি বড় কক্ষ থাকলেও বিভিন্ন প্রোগ্রামের সময় সেখানে বসার জায়গা সংকট হয়ে পড়ত। সহকর্মী ও অতিথিদের জন্য বিষয়টি কষ্টকর হয়ে উঠত। সেই বাস্তবতা থেকেই পুরাতন অডিটোরিয়াম সংস্কার করা হয় এবং নতুন আরেকটি অডিটোরিয়াম নির্মাণ করে অডিটোরিয়াম-১ কাম ক্লাস রুম এবং অডিটোরিয়াম-২ কাম ক্লাস কক্ষ চালু করা হয়। এতে একদিকে পাঠদানের পরিবেশ উন্নত হয়েছে, অন্যদিকে সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলো আরও প্রাণবন্ত ও অর্থবহ হয়েছে। এসব কাজও করা হয়েছে খুব স্বল্প ব্যয়ে, পরিকল্পনা, আন্তরিকতা ও সদিচ্ছাকে শক্তি করে।

নতুন বিজ্ঞান ভবনের পাশে একটি খোলা জায়গা চোখে পড়ে। সেখানে গাছ লাগানোর সুযোগ যেমন ছিল, তেমনি শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার প্রয়োজনও ছিল। এর আগেও আমার সময়কালে শতাধিক উপরে গাছ লাগানো হয়েছে, আর এই ধারাবাহিকতা আমার পূর্বসূরীরাও রেখে গেছেন। সব দিক বিবেচনা করে সেই জায়গাতেই একটি স্থায়ী ব্যাডমিন্টন কোর্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আজ সেই কোর্টের উদ্বোধন হলো। এটি শুধু একটি খেলাধুলার জায়গা নয়, এটি শিক্ষার্থীদের সুস্থ মানসিকতা, শারীরিক বিকাশ ও আনন্দের একটি নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।

এর আগেও কলেজে নিজস্ব অর্থায়নে শহীদ মিনারের চত্বরে একটি খোলা মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বায়োমেট্রিক হাজিরা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা পদ্ধতিতে সময়োপযোগী সংস্কার আনা হয়েছে। কোনো বড় বাজেট নয়, খুব স্বল্প ব্যয়ে কিন্তু কার্যকর পদ্ধতিতে এই পরিবর্তনগুলো করা হয়েছে। লক্ষ্য ছিল একটাই, শিক্ষার্থীদের সময়, শ্রম ও সম্ভাবনাকে সম্মান করা।

প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আজকের এই উদ্বোধন তোমাদের জন্য। তোমাদের পড়াশোনা, তোমাদের নামাজ, তোমাদের খেলাধুলা আর তোমাদের শৃঙ্খলাবোধকে সামনে রেখেই এই পথচলা। এই কলেজ কেবল কয়েকটি ভবনের নামে নয়। এটি তোমাদের স্বপ্ন গড়ার একটি স্থান। তোমরাই এই প্রতিষ্ঠানের প্রাণ, তোমরাই এর ভবিষ্যৎ।

নাম ফলক দিয়ে মানুষ বড় হয় না, কাজ দিয়েই মানুষ মনে থাকে। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের নিয়ত কবুল করেন, এই কাজগুলোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তোমাদের সবাইকে এই প্রতিষ্ঠান থেকে আলোকিত মানুষ হিসেবে বের করে আনেন।

আজকের এই মহতি কাজগুলো বাস্তবায়নে যাঁরা নীরবে, অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের নাম না বললে লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এই কলেজের উপাধ্যক্ষ মহোদয় প্রফেসর মো. এরশাদুল হক , গ্রন্থকারীক জনাব আবু জাফর মো. শরীফ এবং কলেজের কম্পিউটার অপারেটর তুষার কুমার এর প্রতি।

সবশেষে, মহান আল্লাহ পাকের দরবারে অগণিত শুকরিয়া আদায় করছি।

প্রফেসর কাজী শফিকুর রহমান

অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ।

প্রফেসর কাজী শফিকুর রহমান মহোদয়ের ফেসবুক থেকে লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হয়েছে।