ভলান্টিয়ার (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: কুড়িগ্রামে প্রায় ২৫০ বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে ভঙ্গুর অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে নাগেশ্বরী উপজেলার কাচারি পয়রাডাঙ্গা এলাকায়, কুড়িগ্রাম- ভূরুঙ্গামারী সড়কের পাশে নির্মিত শিবমন্দির। যেটি ইতিহাসে ভবানী পাঠকের মঠ নামে পরিচিত।
স্থানীয়দের বেশিরভাগ মানুষ এই মঠকে মন্দির হিসেবেই জানে এবং এখন পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে পূজা অর্চণা করে আসছে। কিন্তু কবে নাগাদ এটি তৈরি করা হয়েছিল তা জানা নেই স্থানীয়দের।
কুড়িগ্রাম জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং রংপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়,
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন কুড়িগ্রামসহ বৃহত্তর রংপুরের ফকির ও সন্ন্যাসীরা। যা ইতিহাসে ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ নামে খ্যাত। এই সংগ্রামে ফকিরদের নেতৃত্বে ছিলেন ফকির মজনু শাহ বুরহানা আর সন্ন্যাসীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভবানী পাঠক। ভবানী পাঠক ছিলেন রংপুরের পীরগাছা এলাকার মন্থনার জমিদার জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানীর নায়েব। তার বাড়ি ছিল কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার পাঠকপাড়ায়। তিনি বিভিন্ন এলাকায় শিবমন্দির নামে মঠ তৈরি করেন। এই মঠগুলোতে অবস্থান নিয়ে সন্ন্যাসীরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এলাকার সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করতেন। সংস্কারের অভাবে কালের সাক্ষী সেই মঠগুলো কোনো রকমে টিকে আছে। পলাশী যুদ্ধের পর রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সুযোগে ফকির ও সন্ন্যাসীরা বিদ্রোহী হয়ে স্বাধীনতার জন্য প্রত্যক্ষ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ১৭৭০ সালে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষের শিকার ভূমিহীন ও নিরন্ন কৃষকদের সমর্থন পান বিদ্রোহীরা। এ সময় বিদ্রোহী সন্ন্যাসীদের মাধ্যমে ভূমিহীন ও নিরন্ন কৃষকদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য ১৭৭০ থেকে ১৭৭২ সালের মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় শিবমন্দির নামে মঠ নির্মাণ করেছিলেন ভবানী পাঠক। তাই এগুলো ভবানী পাঠকের মঠ নামে পরিচিত।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নাগেশ্বরী উপজেলার কাচারী পায়রাডাঙ্গা গ্রামে কুড়িগ্রাম-সোনাহাট স্থলবন্দর মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে অবহেলায়-অযত্নে দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাচীন মন্দিরটি। মন্দিরের উপরে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ডাল-পালা মেলে আছে। ক্ষয়ে গেছে দেয়ালের ইটও। মন্দিরের ভেতরে রাখা আছে দেবী মূর্তি।
যেকোনো সময় মন্দিরটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় সেখানে এখন আর তেমন পূজা অর্চণা করছেন না স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষজন। স্থানীয়রা জানান, অনেক বছর আগে জঙ্গলের ভেতর থেকে মঠটি আবিষ্কার করেন স্থানীয়রা। তারপর থেকেই সেখানে পূজা অর্চণা চলে আসছে। তবে সংস্কারের অভাবে বর্তমানে এই মন্দিরের অবস্থা একেবারের ভঙ্গুর হয়ে পড়ায় কয়েক বছর ধরে ভয়ে আর কেউ মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করছেন না।
স্থানীয় লোকজন বলেন, ‘মন্দিরটি বহু যুগ ধরে এ অবস্থায় আছে। আমাদের বাপ-দাদাদের কাছ থেকে আমরা শুনেছি এটা নাকী দেবী চৌধুরানীর আখড়া ছিল। তারপর সন্নাসীরা এসে এখানে পূর্জ-অর্চণা করত। এখন পূর্জা-অর্চণা কিছু হয়। তবে আর্থিক সংকটের কারণে সংস্কার করা সম্ভব হচ্ছে না। এটি সংস্কার হলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ভালো হত এবং ধর্মীয় ব্যাপারে উপকৃত হতাম।
বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থী সাগর পাল বলেন ‘অনেক পুরনো এই মন্দিরটি সরকারিভাবে সংস্কার করা হলে এখানে ভালোভাবে পূজা করা যেত। অনেক মানুষ এখানে আসত। এটির ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারত। আমরা এই মন্দিরটি সংস্কারের জোর দাবি জানাচ্ছি।’