নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৬ অর্জনে জনাব আদনান আজাদ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগে জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫ অর্জন করায় অধ্যাপক মো. হাসমত আলীকে সংবর্ধনা দিয়েছে বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ)। আজ শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ) ও সেভ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার (সোয়ান) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

আয়োজকেরা বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করা বিবিসিএফের ৩১৪টির বেশি সংগঠন ও তাদের স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের ভাষায়, এটি শুধু সংবর্ধনা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সংরক্ষণকর্মীদের আনন্দ ভাগাভাগিরও একটি উপলক্ষ্য।

উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিবিসিএফের সভাপতি ড. নাছির উদ্দিন। বিবিসিএফের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আরাফাত রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিবিসিএফ এর প্রধান উপদেষ্ঠা ড. মোল্যা রেজাউল করিম, ড. এস এম ইকবাল, আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম দিপু, বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি বাপ্পি খান, অধ্যাপক টিপু সুলতান, কৃষিবিদ শহিদুল ইসলাম, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আতিকুর রহমান মিঠু।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি আদনান আজাদ ও জাতীয় পরিবেশ পদক প্রাপ্ত সংগঠক অধ্যাপক মোঃ হাসমত আলী।

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী আদনান আজাদ বলেন, এই স্বীকৃতি তাঁর একার অর্জন নয়। দীর্ঘদিন ধরে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে মাঠপর্যায়ে কাজ করা অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী, সহকর্মী ও সংগঠনের অবদানের ফল এই পুরস্কার। তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী উদ্ধার করার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা জরুরি। সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু প্রাণী উদ্ধার করলেই সংরক্ষণ হয় না; প্রাণী ও মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে মানুষের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। আদনান আজাদ বিবিসিএফের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্থানীয় সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার সুযোগ তাঁকে মাঠের বাস্তবতা বুঝতে সহায়তা করেছে। তিনি বিবিসিএফের এই আয়োজনের জন্য সংগঠনটির ৩১৪টির বেশি সদস্য সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের ধন্যবাদ জানান।

পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে জাতীয় পরিবেশ পদক পাওয়া অধ্যাপক মো. হাসমত আলী বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকৃতি সংরক্ষণে কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝেছেন, একটি গাছ, একটি প্রজাপতি, একটি পাখি কিংবা একটি ছোট জলাভূমিও একটি বড় বাস্তুতন্ত্রের অংশ। তিনি নিজের উদ্যোগে গড়ে তোলা উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, শিক্ষার্থী ও তরুণদের প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হবে। হাসমত আলী বলেন, জাতীয় পরিবেশ পদক তাঁকে আরও বেশি দায়িত্বশীল করেছে। ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশ শিক্ষা নিয়ে আরও কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁকে সম্মানিত করার জন্য বিবিসিএফ ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সংরক্ষণকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

ড. মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, আদনান আজাদ শুধু একজন বন্যপ্রাণী উদ্ধার কর্মী নন, তিনি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের দীর্ঘদিনের একজন কর্মী। বিবিসিএফ গড়ে ওঠার শুরুর দিকের সদস্যদের একজন হিসেবে আদনানের অবদান অপরিসীম।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সংরক্ষণ কর্মীদের এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বিবিসিএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত দুই সংরক্ষণকর্মীকে নিয়ে এমন আয়োজন করায় বিবিসিএফকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

বন অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ড. মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, সংরক্ষণে শুধু নীতি থাকলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সাতছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামো ও মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।

ড. এস এম ইকবাল বলেন, কোনো প্রাণীকে সংরক্ষণ করতে চাইলে প্রথমে মানুষকে বোঝাতে হবে সেই প্রাণীটি প্রকৃতি ও মানুষের কী কী উপকার করে। মানুষের কাছে বন্যপ্রাণীর গুরুত্ব স্পষ্ট না হলে শুধু আইন করে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ নিশ্চিত করা কঠিন।আদনান আজাদ ও হাসমত আলীর কাজকে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগের শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই দুই ব্যক্তিকে সম্মান জানানোর মাধ্যমে বিবিসিএফ মাঠপর্যায়ের সব সংরক্ষণকর্মীকেই সম্মান জানিয়েছে।

আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম দিপু বলেন, আদনান আজাদ কুমিরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী নিয়ে দেশে ও বিদেশে কাজ করেছেন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি। তিনি বলেন, পুরস্কার পাওয়া মানে কাজ শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বরং দায়িত্ব আরও বেড়ে যাওয়া।
আদনান আজাদ ও হাসমত আলীর মতো সংরক্ষণকর্মীদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।

সারোয়ার আলম দিপু বিবিসিএফের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সংরক্ষণকর্মীদের একই জায়গায় এনে তাঁদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত হওয়া দরকার।

কৃষিবিদ শহিদুর রহমান বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ শুধু বন বা অভয়ারণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের বসতি ও কৃষিজমির সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

তিনি দেশীয় ও অপ্রচলিত গ্রামীণ ফলের গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন এবং পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে মানুষের পাশাপাশি পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল তৈরির কথা বলেন।
আদনান আজাদ ও হাসমত আলীর কাজের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগ কীভাবে বৃহত্তর সংরক্ষণ আন্দোলনে ভূমিকা রাখতে পারে, তাঁদের কাজ তার উদাহরণ। এমন আয়োজনের জন্য বিবিসিএফকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আতিকুর রহমান মিঠু বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য হ্রাসের চিত্র তুলে ধরে বলেন, গত ২০০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩০০ প্রজাতি হারিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য বড় সতর্কবার্তা।তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক এবং স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আদনান আজাদ ও হাসমত আলীর জাতীয় স্বীকৃতিকে তিনি সংরক্ষণ আন্দোলনের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি বাপ্পি খান বলেন, বন্যপ্রাণী ও প্রাণীকল্যাণ নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করা মানুষের স্বীকৃতি পাওয়া জরুরি। আদনান আজাদ দীর্ঘদিন ধরে বন্যপ্রাণী উদ্ধারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করেছেন। তাঁর এই অর্জন তরুণদের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে উৎসাহিত করবে।
তিনি হাসমত আলীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিবেশ সংরক্ষণেরও প্রশংসা করেন এবং দুই পুরস্কারপ্রাপ্তকে অভিনন্দন জানান। পাশাপাশি তাঁদের সম্মান জানাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের একত্র করার জন্য বিবিসিএফকে ধন্যবাদ জানান।

অধ্যাপক টিপু সুলতানও দুই পুরস্কারপ্রাপ্তের কাজের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সংরক্ষণ আন্দোলনে ব্যক্তি উদ্যোগ ও সামাজিক সংগঠনের ভূমিকা আরও বাড়াতে হবে। তরুণদের এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

 

অনুষ্ঠানের সভাপতি বিবিসিএফের সভাপতি ড. নাছির উদ্দিন বলেন, “আজকের আয়োজনকে আমি শুধু সংবর্ধনা হিসেবে দেখি না। আমরা আনন্দ ভাগাভাগি করতে একত্রিত হয়েছি। আদনান আজাদ ও হাসমত আলীর অর্জন আমাদের সবার অর্জন।”

তিনি বলেন, বিবিসিএফের ৩১৪টির বেশি সংগঠন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বন্যপ্রাণী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করছে। জাতীয় পর্যায়ে দুই সংরক্ষণকর্মীর স্বীকৃতি সেই বিশাল স্বেচ্ছাসেবী পরিবারেরও আনন্দের বিষয়।আদনান আজাদের দীর্ঘদিনের কাজের কথা উল্লেখ করে ড. নাছির উদ্দিন বলেন, তিনি শহর থেকে মাঠপর্যায়ের সাধারণ মানুষ ও সংরক্ষণকর্মীদের সঙ্গে ভালোভাবে যুক্ত। এই অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে কাজে লাগানো যেতে পারে।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন প্রাণবান্ধব প্রধানমন্ত্রী। প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে সরকারের যে ভাবনা রয়েছে, তা বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মাঠের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষদের যুক্ত করা দরকার।”

আদনান আজাদকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সম্পৃক্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান ড. নাছির উদ্দিন। তাঁর মতে, আদনানের মতো মাঠপর্যায়ের মানুষের অভিজ্ঞতা জাতীয় নীতিতে প্রতিফলিত হলে বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর হবে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ও অনুভূতি ব্যক্ত করেন কোষাধ্যক্ষ মোঃ জাহিদুল ইসলাম, সোহাগ রায় সাগর, শুভ সাহা, শেইখ গালিব, ইমরান রাশেদ, হাবিবুল্লাহ মন্ডল, সোহাগ, রাকিব, কারিম, আবু সাইদ, মামুনসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণকর্মীরা।

বক্তারা বলেন, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী, গবেষক ও তরুণদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা ভবিষ্যতে বিবিসিএফের ৩১৪টির বেশি সংগঠন ও দেশব্যাপী স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করে স্থানীয় পর্যায়ের সংরক্ষণ উদ্যোগগুলোকে জাতীয় সংরক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।