লেখক: সাইফুল ইসলাম পলাশ
যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, রাজশাহী ।
ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি: কয়েকদিন আগে সরকারি একটা প্রশিক্ষণ একাডেমিতে ক্লাশ নেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম। সকলেই প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা।
ক্লাশ শেষে প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্য থেকে অনুভূতি প্রকাশের পালা।
হালকা-পাতলা গড়নের একজন সুদর্শন কর্মকর্তা কিছু বলার জন্য সামনে এলেন। আমি অধীর আগ্রহে তার কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছি।
অফিসার আইন-আদালতের গল্প বলা শুরু করলো। কিন্তু এ কী শুনছি! এসবতো রোজকার গল্প। আমি কিছুটা বিব্রত। নিশ্চয়ই ক্লাশ ভালো হয় নি। তাই ক্লাশের কথা বাদ দিয়ে অন্য গল্প করছে।
অফিসার বলছে…
” আজ থেকে ৮/৯ বছর আগের ঘটনা। গ্রামের একটি ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য মাস্টার্স করে চাকুরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। দরিদ্র বাবার প্রত্যাশা ছেলেটা এবার সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু প্রতিপক্ষ জমি বিরোধের জের ধরে তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একটি মারামারির মামলা দেয়। সেই মামলায় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে তার নামটিও জড়িয়ে দেয়। অথচ সে ঘটনার সময় ঘটনাস্থলেই ছিল না। ”
“ছেলেটার ৩৫ তম ব্যাচে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদে চাকুরী হয়। কিন্তু মামলা থাকার কারণে যোগদান করতে পারেনি। পরের বার ৩৬ তম ব্যাচে আবারও একই চাকুরী হয়। তখন পুলিশ ভেরিফিকেশন চলছিল। এটা জানার পর বিচারক স্বউদ্যোগে ঘন ঘন তারিখ দিলেন। বিচারে ছেলেটা খালাস পেল। তারপর সে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর! ”
এতক্ষণে অফিসারের কথা শুনে ভালো লাগলো। এই মামলায় বিচারকের তেমন কোনো ভূমিকাই ছিল না। বিচারে আবেগের কোন স্থান নেই। বিচারক কেবল আইন অনুসারে বিচার করবেন। কিন্তু এখানে বিচারক শুধু একটু সহানুভূতিশীল হয়ে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করেছেন। আর এতেই ছেলেটার জীবন বদলে গেছে। এভাবে যখন কেউ আমার সহকর্মীদের কথা ভাল বলে তখন গর্বে বুকটা ভরে উঠে।
“পরের বছর ছেলেটা বিসিএস (নন-ক্যাডার)।” বলতে বলতে অফিসারের কন্ঠ আড়ষ্ট হয়ে উঠে। মনে হচ্ছে কেঁদে ফেলবে।
অফিসার বললেন, ”এতক্ষণ যে ছেলেটার কথা বললাম… সেটা আর কেউ নয়… আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে এই আমি! আর যে বিচারকের কথা বলছিলাম… তিনি আমাদের সামনে উপস্থিত! ”
অফিসারের এই কথা শোনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমার কান দু’খানা লাল আর গরম হয়ে গেছে। দেখলাম, মানুষ কত অল্পতেই তুষ্ট আর কৃতজ্ঞ।
আমি কোনভাবেই তাঁকে মনে করতে পারছিলাম না। হাজারো মামলার ভিড়ে মনে না থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যিনি সেবা পান তার মনে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কৃতজ্ঞ থাকেন। এ জগতে যার মাঝে অল্পতেই তুষ্ট হওয়ার গুণ আছে এবং কৃতজ্ঞতাবোধ আছে, তার মত ধনী আর কেউ নেই।
