ভলান্টিয়ার (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি: কুষ্টিয়াতে আবারও রাসেলস ভাইপার সাপ উদ্ধার করা হয়, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বানিয়াপাড়া আতিয়ার মোড় সংলগ্ন পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়।
ভারত ও শ্রীলংকার মত আমাদের বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায়, বিশেষ করে পদ্মা তীরবর্তী কয়েকটি জেলা ও চরাঞ্চলে বেশ কিছুদিন যাবত কয়েকটি বিষাক্ত রাসেলস ভাইপার সাপ উদ্ধার করা হয়। এই সাপের কামড়ে বেশ কয়েকজন মারা গিয়েছেন এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।
রাসেলস ভাইপার সাপ বাংলাদেশে চন্দ্রবোড়া বা উলুবোড়া নামেও পরিচিত।
বাংলাদেশে যেসব সাপ দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বিষাক্ত।
এই সাপের কামড়ে শরীরের দংশিত অংশে বিষ ছড়িয়ে অঙ্গহানি, ক্রমাগত রক্তপাত, রক্ত জমাট বাঁধা, স্নায়ু বৈকল্য, চোখ ভারী হয়ে যাওয়া, পক্ষাঘাত, কিডনির ক্ষতিসহ বিভিন্ন রকম শারীরিক উপসর্গ দেখা যেতে পারে।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাপের এই প্রজাতিটি বাংলাদেশ থেকে বহু বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু গত ১০-১২ বছর আগে থেকে আবারো এই সাপের কামড়ের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
ভারত থেকে নদীতে কচুরিপানার সঙ্গে ভেসে আসে এই রাসেলস ভাইপার সাপ সারাদেশে এখন এর বিচরণ।
রাসেলস ভাইপারের পুনরাবির্ভাব বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৭টি জেলাতে রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি ছিল কিন্তু এখন প্রায় জেলাতে ই রাসেল ভাইপারের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।এক গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতেই এই সাপের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল।
সম্প্রতি কালে এক জরিপে দেখা যায় কুষ্টিয়া পদ্মা গড়াই নদীর তীরবর্তী অঞ্চল সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ রাসেল ভাইপার দেখা মিলছে এবং পদ্মা গড়াই নদীর চরের বিভিন্ন স্থান থেকে সাপের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে এই সাপগুলো ভারত থেকে নদী পথে এসেছে এরা বাচ্চা পারে বিধায় দ্রুত বংশ বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে এরা জঙ্গল এবং বালির মধ্যে থাকতে পছন্দ করে এরা বালুর মধ্যে এমন ভাবে নিজেকে লুকিয়ে রাখে যে ওর গায়ের উপর দিয়ে হেটে গেলেও ও চুপ করে থাকে, এরা নেশাচর প্রাণী রাতে শিকারের জন্য বালুর মধ্য থেকে মুখ বের করে ছোট ছোট পাখি, ইঁদুর, টিকটিকি, গিরগিটি সহ যে সমস্ত ছোট ছোট প্রাণীরা চরে ঘোরাফেরা করে তাদেরকে শিকার করে আবার বালুর মধ্যে লুকিয়ে থাকে, দিনের বেলায় এরা চরে বালুর মধ্যে লুকিয়ে থাকে সূর্যের তাপে বালু গরম হলেও এদেরকে কাবু করতে পারে না। এখন নদীতে পানি আসার কারণে সমস্ত চর ডুবে যায় চরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সাপগুলো এখন উঠে লোকালয়ে চলে আসতে শুরু করেছে যার জন্য মানুষ বিপদে সম্মুখীন হচ্ছে।
আজ রাসেলস ভাইপার সহ বিভিন্ন সাপ বৃদ্ধির কারণের জন্য আমরাই দায়ী কারণ প্রকৃতি একটি প্রাণী দিয়ে আরেকটি প্রাণীকে দমন করে কিন্তু আজ মানুষের রোশনালে পরে বিভিন্ন প্রাণীদের হত্যা করা হচ্ছে যেমন বেজি,মেছো বিড়াল,বন বিড়াল, গুইসাপ, নেইল, গন্ধগোকুল এসব প্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার কারণে সাপের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে,কারণ সাপের বাচ্চা হওয়ার সাথে সাথে এসব প্রাণীগুলো সাপের ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে খেয়ে ফেলত এখন এসব প্রাণী গুলো না থাকার জন্য আমাদেরকে এই মহা বিপদে সম্মুখীন হতে হচ্ছে আর এর জন্য আমরা দায়ী। তাছাড়া আমাদের দেশে বেদে গোষ্ঠী বলে পরিচিত একটি দল আছে যারা সারা বাংলাদেশে নির্ভয়ে নির্বিচারে এসব নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করে এদের মাংস খায় এবং চামড়া গুলো বিক্রয় করে, এদের জন্যই আজ এই প্রাণীগুলো বিলুপ্তির পথে। আমরা যদি সকলে এদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি, সচেতন করানো যায়,এদের শিকার করা থেকে ফেরানো যায় তাহলে হয়তো প্রকৃতির সন্তানেরা রক্ষা পাবে তা না হলে খুব দ্রুতই প্রকৃতি ধ্বংস হবে এবং বড় বড় মহামারী আমাদেরকে তাড়া করবে।
আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে কারণ এই সাপের বিষ ‘হোমোটক্সিন’ হওয়ায় মাংস পঁচেই আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়। সাপটির কবল থেকে বাঁচতে সচেতনতাই কার্যকর পথ।
সাধারণত কৃষি জমিতে থাকে বলে মানুষ অনেক সময়ই সাপের গায়ে পা দেয় বা না জেনে একে বিরক্ত করে থাকে। আর রাসেলস ভাইপার বিপদাপন্ন বোধ করলে আচমকা আক্রমণ করে থাকে।
এই প্রজাতির সাপের কামড়ের কিছুক্ষণ পরই দংশিত স্থানে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। ব্যাখার পাশাপাশি দংশিত স্থান দ্রুত ফুলে যায় এবং ঘণ্টা খানেকের মধ্যে দংশিত স্থানের কাছে শরীরের আরো কয়েকটি অংশ আলাদাভাবে ফুলে যায়।
দ্রুত চিকিৎসা না করা হলে নিম্ন রক্তচাপ, কিডনি অকার্যকর হওয়া সহ বিভিন্ন ধরণের শারীরিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ সাপের দংশনে দংশিত হয়, যার মধ্যে প্রতি বছর অন্তত এক লাখ মানুষ মারা যায়।
আর সাপের দংশনে আহত হয়ে বছরে প্রায় ৪ লাখ মানুষের অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় অথবা পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
এরা প্রচন্ড ভীতু সহজে আক্রমণ করে না, কয়েকজন এই রাসেল ভাইপার সাপ কে অজগর সাপের বাচ্চা মনে করে লালন পালন করতেছিল আমি নিজেও নার্সিং করেছি তাতে বোঝা গেল ওরা ভীতু প্রকিতির। তবে প্রচন্ড গতিতে আক্রমনাত্মক হয়ে থাকে। পৃথিবীতে প্রতিবছর যত মানুষ সাপের কামড়ে মারা যায়, তার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এই চন্দ্রবোড়ার কামড়ে মারা যায়। এদের বিষদাঁত বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃহৎ। এরা প্রচণ্ড জোরে হিস হিস শব্দ করতে পারে। তবে আমাদের দেশে যে পরিমাণ রাসেল ভাইপার বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে আমাদেরকে সব সময় সাবধানে থাকতে হবে বিশেষ করে নদী তীরবর্তী অঞ্চল এবং কৃষি খেত অঞ্চলে, বিগত আঠারো মাসে আমি আটটি রাসেলস ভাইপার সাপকে লোকালয় থেকে উদ্ধার করেছি এইটা দিয়ে নয়টি রাসেলস ভাইপার সাপ উদ্ধার করা হলো,তাতে বোঝা যাচ্ছে আমাদের দেশে এখন রাসেলস ভাইপার সাপ সব স্থানেই বিরাজ করছে।
বাংলাদেশে রাসেলস ভাইপারের দংশনের হার খুব বেশি না হলেও ভারতে প্রতি বছর যে পরিমাণ সর্প দংশনের ঘটনা ঘটে তার মধ্যে অন্তত ৪৩% এবং শ্রীলঙ্কায় প্রতি বছর মোট সর্প দংশনের ঘটনার ৩০-৪০% রাসেলস ভাইপারের কারণে হয়ে থাকে।
উদ্ধার শেষে রাসেল ভাইপার সাপটিকে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
লেখক: প্রকৃতি প্রেমিক শাহাবুদ্দিন মিলন
