লেখক: অধ্যক্ষ শাহজালাল সবুজ
*জাতীয় জীবনে যুব সমাজের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস*
আমাদের যুব সমাজ জাতির আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থল।
জাতীয় জীবনে যে কোন গুরুত্বপূর্ণ, যে কোন আপদকালীন মুহূর্তে যুবসমাজই অগ্রণী এবং সাহসী ভূমিকা পালন করছে-।
*১৯৫২ সালের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার সংগ্রাম*
ব্রিটিশদের বিতাড়িত করার সাথে সাথে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর এর দুটি অংশের মাঝে ধর্মের মিল ছাড়া অন্যকোনাে মিল ছিল না। শুরু থেকে পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠী এদেশের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এর ফলে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলন ১৯৫২ সালে চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। বাংলার ইতিহাসে পাকিস্তানের শােষণের বিরুদ্ধে এটাই ছিল বাঙালি জাতির প্রথম বিদ্রোহ।
ভাষা আন্দোলনের সাহসী সৈনিক বাংলার গ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রভাষা দিবসের ঘােষণা দেয়। অপরদিকে, একই দিন (২১ ফেব্রুয়ারি) ছিল পাকিস্তান সরকারের বাজেট অধিবেশনের দিন। ছাত্রদের কর্মসূচিকে বানচাল করার জন্য সরকার পূর্বেই ১৪৪ ধারা জারি করলে, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্ররা এক জরুরি বৈঠকে সমবেত হয় এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ঐ দিন সর্বাত্মক হরতাল পালনের মধ্যদিয়ে ছাত্ররা প্রতি দশজনের একটি মিছিল বের করে। ভাষা আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য পুলিশ বাহিনী মাঠে নামে। পুলিশ ছাত্রদের উপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। যখন দেখা যায়, একপর্যায়ে এগুলাে কোনাে কাজ করতে পারছে না তখন পুলিশ মিছিলের উপর গুলি চালায়। ফলে বরকত, সালাম, জব্বার ও রফিকহ নাম না জানা আরােও অনেকেই নিহত হয়। ফলে ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা অরও বাড়তে থাকে এবং বাঙালিরা মায়ের ভাষা বাংলা এই আন্দোলনের মাধ্যমে ছিনিয়ে নিয়ে আসে। আর এ আন্দোলনে পিচ ঢালা রাজ পথে যারা রক্ত দিয়ে সংগ্রাম করে বিজয়ের পতাকা উড্ডীন করেছিলেন তারা সকলেই ছিল তরুণ ও যুবক।
*১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী যুবসমাজ*
মহান মুক্তির সংগ্রামে আপামর জনতার পাশাপাশি ছাত্র ও যুব সমাজের ভূমিকা ছিল অহঙ্কার করার মতো। সেদিন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং অধিকাংশ সেক্টর কমান্ডার ছিলেন টগবগে যুবক। ১৯৭১’র মুক্তিযুদ্ধে লুঙ্গিপড়া গ্রামের সাধারণ যুবকরাও সরাসরি যোগ দেন। স্বাধীনতা পরবর্তি যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত পরিবেশ কাটিয়ে এ বর্তমান উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি আনয়নে রয়েছে যুব সমাজের যুগান্তকারী ভূমিকা। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এ দেশের যুবশক্তির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবীড় ও গভীরে।
*কুরআনের প্রেমে জীবন দিল অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র শীষ মোহাম্মদ*
ঘটনাটি ১৯৮৫ সালের ১২ এপ্রিলের। পদ্মপল চোপরা ও শীতল সিং নামের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দু’জন মুসলিমবিদ্বেষী ব্যক্তি কুরআনের সকল আরবি কপি ও অনুবাদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে। রিটের বিবৃতিটি ছিলো, “কুরআনে এমন কিছু আয়াত আছে যেখানে কাফির ও মুশরিকদের হত্যা এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রেরণা দেয়া হয়েছে, তাই এই গ্রন্থ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্ম দিতে পারে।” বিচারক মিসেস পদ্মা খাস্তগীর এই মামলা গ্রহণ করেন এবং এ বিষয়ে তিন সপ্তাহের মধ্যে অ্যাফিডেভিট প্রদানের জন্য রাজ্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেয়। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সারাবিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
১০ মে জুমার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ থেকে ছাত্র-জনতার মিছিল বের হয়। যাতে বাংলাদেশ পুলিশ সরকারি নির্দেশ মোতাবেক লাঠিচার্জ করে। এই বাধার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১১ মে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঈদগাহ ময়দানে তৌহিদি জনতা সমাবেশ আয়োজন করেন। পুলিশ সমাবেশে ১৪৪ ধারা জারি করে। উপস্থিত জনতা শুধুমাত্র দু’আ করার অনুমতি চাইলে তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লা তা না দিয়ে পুলিশকে গুলি করার নির্দেশ দেয়। মুহুর্মুহু গুলিতে তাৎক্ষণিক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে দশম শ্রেণীর ছাত্র শিবিরকর্মী আব্দুল মতিন। হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় শীষ মোহাম্মদ, রশিদুল হক, ৮ম শ্রেণীর ছাত্র সেলিম, সাহাবুদ্দীন, কৃষক আলতাফুর রহমান সবুর, রিকশাচালক মোক্তার হোসেন ও রেলশ্রমিক নজরুল ইসলাম শহীদ হন। আহত হয় অর্ধ শতাধিক মানুষ।
পরের দিন ১২ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী সকল বাধা উপেক্ষা করে কারফিউ ভেঙে জুম্মার নামাজের পর নৃশংস সেই হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে শোককে শক্তিতে পরিণত করতে রাজপথে নেমে আসে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এমন ঘটনা সারা বিশ্বব্যাপী আালোড়ন সৃষ্টি করে। ১৩ মে প্রশাসনের সকল বাধা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালন করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কুরআনপ্রেমী মানুষ। মুসলমানরা বিশ্বব্যাপী এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণের প্রতিবাদে ফেটে পড়লে ভারত সরকার বাধ্য হয়ে হাইকোর্টের রায়টি প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলে ১৩ মে কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি বিসি বাসকের আদালতে স্থানান্তরিত করে এটি খারিজ করে দেওয়া হয়।
কুরআন অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যেখানে সকল মুসলমানের কর্তব্য সেখানে ইসলামী জনতার উপর গুলিবর্ষণ করে ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় রচনা করেছিল বাংলাদেশের কিছু মুসলমান নামধারী প্রশাসন ও পুলিশ।
এ দিনটিকে স্মরণ করতেই বাংলাদেশের কোরআন প্রেমী মানুষ “কুরআন দিবস” হিসেবে প্রতি বছর পালন করে।
*১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন*
৯০ এর আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ যখন তৎকালীন সেনাপ্রধান লেঃ জেঃ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন । সে সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। সেনাপ্রধান লেঃ জেঃ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেই সামরিক আইন জারি করেন । সেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করে ছাত্ররা । ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে উঠা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে সেনাবাহিনীর হামলায় জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালী সাহা সহ অনেক ছাত্র/ছাত্রী নিহত হয় । তখন থেকে জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে একটি লাগাতার ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়।
সব কয়টি ছাত্র সংগঠনের মিলিত শক্তির আন্দোলনের কাছে সেনাবাহিনী সমর্থিত জেনারেল এরশাদ টিকতে পারে নাই । সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য এর আন্দোলনের সাথে দেশের জনগণ সম্পৃক্ত হলে তা গণ আন্দোলন থেকে গণ অভ্যুত্থানে রুপ নেয় । সেই গণ অভ্যুত্থানে জেনারেল এরশাদ ৪ঠা ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং ৬ই ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন । দীর্ঘ ৯ বৎসর পরিচালিত আন্দোলন ১৯৯০ এ এসে গণ আন্দোলনের রুপ নেয় । সেই গণ আন্দোলনে এরশাদ পদত্যাগ করেছিল । ইতিহাসে তা ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন হিসেবে পরিচিত । ১৯৯০ এর আন্দোলনের সফল সমাপ্তি ঘটেছিল মূলত ছাত্রনেতাদের দৃঢ়তায় ।
ধারাবাহিক আলোচনা চলবে….
