ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি:
*কিশোর সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ : যার তেলাওয়াত শুনে কেঁদেছেন বিশ্বনবি (সা)*
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) ইসলাম গ্রহণের তালিকায় তার নাম ৬ নম্বরে। তিনি বিশ্বনবির ঘরেই লালিত-পালিত হন। তাঁকে অনুসরণ করে জীবনাচার ও চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন করেন। এ কারণেই বিশ্বনবি বলতেন-
‘হেদায়াত প্রাপ্তি, আচার-আচরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তিনিই (আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ) হচ্ছেন রাসুলুল্লাহর (সা) সবচেয়ে নিকটতম উত্তম ব্যক্তি।’
আল্লাহ তাআ’লা কুরআন দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বিশ্বমানবতার কল্যাণে রাসুলুল্লাহর (সা) ওপর নাজিল করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম এ কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ ধারক ও বাহক। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)। যার তেলাওয়াত শুনলেই ঈমান বেড়ে যেত। অস্রুসিক্ত হতো মুমিন মুসলমান এবং বিশ্বিনবি (সা) নিজেও কেঁদে ফেলতেন।
আল্লাহর রাসুলের প্রিয় সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বিশ্বনবির শিক্ষালয়ে শিক্ষা লাভ করেন। তিনি কুরআনের সাধক হিসেবে আজো বিশ্ববিখ্যাত। তার ব্যাখ্যা এবং মতামত এখনো সবার শীর্ষে গ্রহণযোগ্য। তিনি ছিলেন কুরআনুল কারিমের একনিষ্ঠ সেবক ও গবেষক। জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় তিনি কুরআন গবেষণায় ব্যয় করেছেন। হয়েছেন রইসুল মুফাসসিরিনদের একজন।
ইতিহাস সাক্ষী, কটু কথা ও নির্যাতনকে উপেক্ষা করে অসীম সাহসী কুরআনের সাধক আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ কাবা শরিফে সুরা আর-রাহমানের কিছু অংশ তেলাওয়াত করে হিংস্র কুরাইশ নেতাদের হতবাক করে দেন। হিজরতের আগে মক্কার কঠিন পরিস্থিতিতে বিশ্বনবীর পর তিনিই সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে পবিত্র কুরআনুল কারিম তেলওয়াত করেন যখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২/১৩ বছর।
হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘একদিন রাতের বেলা রাসুলুল্লাহ (সা) আবু বকরের সাথে মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। আমিও তাঁদের সাথে ছিলাম।
কিছুক্ষণ পর রাসুলুল্লাহ (সা) বের হলেন, ‘আমরাও তাঁর সাথে বের হলাম। বেরিয়েই আমরা দেখতে পেলাম, এক ব্যক্তি মসজিদে দাঁড়িয়ে; কিন্তু আমরা তাঁকে চিনতে পারলাম না।
রাসুলুল্লাহ (সা) কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর কুরআন তেলাওয়াত শুনলেন। তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন-
‘যে ব্যক্তি বিশুদ্ধভাবে কুরআন পাঠ করে আনন্দ পেতে চায়, যেমন তা অবতীর্ণ হয়েছে, সে যেন ইবনে উম্মু আবদের (আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ) পাঠের অনুরূপ কুরআন পাঠ করে।’
হজরত ওমর (রা) তাঁকে খোলাফায়ে রাশেদার যুগে কুরআনের শিক্ষক হিসেবে কুফায় পাঠিয়ে দেন। তিনি কুফার কাজির দায়িত্বও পালন করেন।
রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সকল গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। বদর যুদ্ধে দু’জন কিশোর সাহাবি হযরতে মা’আজ ও মুয়াওযাজ (রা) ইসলামের কট্টর দুশমন আবু জাহলকে হত্যা করে ময়দানে ফেলে আসে। যুদ্ধশেষে রাসূল সা. বললেনঃ ‘কেউ যেয়ে আবু জাহলের অবস্থা একটু দেখে আস তো।’ আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ দৌড়ে চলে গেলেন। আবু জাহলের প্রাণস্পন্দন তখনও থেমে যায়নি। আবদুল্লাহ তার দাড়ি সজোরে মুট করে ধরে বললেনঃ ‘বল, তুই আবু জাহল কিনা?’
উহুদ, খন্দক, হুদাইবিয়া, খাইবারসহ মক্কা বিজয়েও তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথী ছিলেন। হুনাইন যুদ্ধে কাফিরদের অতর্কিত আক্রমণে দশ হাজারের মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। মাত্র আশিজন যোদ্ধা নিজেদের জীবনকে বাজি রেখে রাসূলুল্লাহর সা. চতুষ্পার্শে অটল থাকেন। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ সেই আশিজনের একজন। এ যুদ্ধে রাসূল সা. মুশরিক বাহিনীকে লক্ষ্য করে যে এক মুঠো ধূলো নিক্ষেপ করেছিলেন, রাসূলুল্লাহর সা. হাতে তা তুলে দিয়েছিলেন আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা)।
*অদম্য সাহসী এক সাহাবি হযরত যুবাইর (রা.)*
মক্কায় একবার এই গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে কাফেররা রাসুল (সা.)–কে বন্দী অথবা হত্যা করেছে। খবরটি শোনামাত্র একটি বালক ক্ষিপ্ত হয়ে তলোয়ার হাতে বেরিয়ে পড়ল। ঘটনাটির সত্য–অসত্য নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে হাজির হলো রাসুল (সা.) এর দরবারে। রাসুল (সা.) তাঁকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে?
সে উত্তর দিল, আমি শুনেছি আপনি বন্দী অথবা নিহত হয়েছেন। তাই আমি প্রতিশোধ নিতে বেরিয়েছি। তাঁর প্রতি বালকটির এমন ভালোবাসা আর সাহস দেখে রাসুল (সা.) অত্যন্ত মুগ্ধ হন। তিনি বালকটির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.) নামে সেই বালকটিই ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবিদের একজন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
রাসুল (সা.) যুবাইর (রা.)-এর উদ্দীপনায় সংকট হয়ে বলেছিলেন, প্রত্যেক নবীরই একজন ঘনিষ্ঠ অনুসারী থাকে। যুবাইর আমার অনুসারী।
অল্প বয়স থেকেই যুবাইর (রা.) ছিলেন খুব দুঃসাহসী। ছোটবেলা থেকেই তিনি বড় বড় পালোয়ান ও শক্তিশালী লোকদের সঙ্গে কুস্তি লড়তেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অনন্য। অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে ইসলামের প্রায় সব যুদ্ধেই অসামান্য অবদান রেখেছেন।
বদরের যুদ্ধে শত্রুপক্ষের আঘাতে যুবাইর (রা.)–র শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। একটি ক্ষতের গভীরতা গর্তের মতো হয়ে যায়। পরে তাঁর ছেলে বলেছিল, আমরা বাবার সেই গর্তে আঙুল ঢুকিয়ে খেলা করতাম।
উহুদের ময়দানে যখন পরিস্থিতি মুসলিমদের প্রতিকূলে গিয়ে রাসুল (সা.) অরক্ষিত হয়ে পড়েন, সে সময় যে ১৪ জন সাহাবি নিজেদের জীবনের বিনিময়ে রাসুল (সা.)-কে কেন্দ্র করে প্রতিরোধ করেন যুবাইর (রা.) ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তাঁর এমন দুঃসাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর মা সাফিয়া (রা.)–র অবদান ছিল অনেক।
খন্দকের যুদ্ধের সময়ের কথা। মদিনার ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজা মুসলমানদের সঙ্গে সম্পাদিত মৈত্রী চুক্তি ভেঙে ফেলে। রাসুল (সা.) তাঁদের অবস্থা জানতে গুপ্তচর হিসেবে কাউকে পাঠাতে চাইলেন। সাহাবাদের উদ্দেশ্য করে তিনি তিনবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে তাদের সংবাদ নিয়ে আসতে পারবে? প্রত্যেকবারই যুবাইর (রা.) বললেন, আমি! ইয়া রাসুলুল্লাহ!
মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা.) মুসলিম সেনাবাহিনীকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেন। সর্বশেষ এবং ছোট দলটিতে ছিলেন রাসুল (সা.) নিজে। এ দলটির পতাকাবাহী ছিলেন যুবাইর (রা.)।
উমর (রা.)–এর শাসনামলে ইয়ারমুক নামে একটি যুদ্ধ হয়। সে যুদ্ধে যুবাইর (রা.) অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধে যুবায়ের (রা.) মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। উমর (রা.)–র মৃত্যুর পর শূরা কমিটিতে খলিফা নির্বাচনের জন্য যে ছয়জন সাহাবির নাম ছিল, তাঁদের একজন ছিলেন যুবাইর (রা.)। ইসলামের ইতিহাসে যুবাইর (রা.)–র অসামান্য অবদান যুব সমাজের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরদিন।
ধারাবাহিক আলোচনা চলবে…..
