লেখক : সাইফুল ইসলাম পলাশ
যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ।

অরণ্যপুর নামের এক গভীর জঙ্গল রাজ্যের শাসক ছিলেন সিংহরাজ দুর্জয়। একদিকে তিনি ছিলেন বলশালী ও কর্তৃত্বপরায়ণ, অন্যদিকে সদিচ্ছায় পূর্ণ একজন শাসক। রাজা বিশ্বাস করতেন, “শাসন মানে শৃঙ্খলা। আর শৃঙ্খলা মানেই কঠোর আইন।”

কিন্তু একদিন তিনি লক্ষ্য করলেন, বনের শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। খরগোশেরা নালিশ করছে হায়েনাদের বিরুদ্ধে, বানরদের অভিযোগ হরিণদের চালাকি নিয়ে, আবার গুইসাপেরা বলে, “জলের ভাগ তো সব সময় জিরাফদেরই যায়!”

রাজা বিরক্ত হলেন। তিনি বললেন, “আর নয়! এবার আমি নিজে নতুন আইন করব, যাতে সবাই বুঝে, কে কতটুকু জায়গা পাবে, কী খেতে পারবে, কোথায় চলবে, কে কখন কথা বলবে।”

মন্ত্রীপরিষদে ছিল বাঘ, চিতা, ভালুক ও পেঁচা। পেঁচা কণ্ঠ নিচু করে বলেছিল, “প্রভু, আইন প্রণয়ন বড় কাজ। আগে বনবাসীদের মতামত নেওয়া যাক।” কিন্তু রাজা গর্জন করলেন-“তুমি রাতের পাখি, সূর্যের রাজনীতি বোঝো না। আমি রাজা, আমি জানি কী ভালো।”

তিনদিনের মধ্যে নতুন আইন পাশ হলো। নামে সেটি ছিল ‘অরণ্য নীতি-১’।

আইনে বলা হলো-

★ প্রতিটি প্রাণীকে দিনে মাত্র একবার পানি খেতে হবে।

★ খাদ্য সংগ্রহ করতে হলে রাজ দরবারে ফি দিতে হবে।

★ গর্ত, গাছ, কন্দ বা গুহা- সব বাসস্থান এখন থেকে রাজ সম্পত্তি।

প্রথম দিন সবাই চুপ করে মানল। কিন্তু দ্বিতীয় দিন শুরু হলো অশান্তি।
হরিণেরা বলল, “আমরা একবার পানি খেলে চলতে পারি না!”
বানররা বলল, “ফি দিয়ে ফল পাড়া মানে না খেয়েই থাকতে হবে!”
মৃগীর দুধপানের সময় বাচ্চারা কেঁদে উঠল। গর্তে বাস করা প্রাণীরা বলল, “আমরা নাকি নিজের গৃহে অতিথি!”

তৃতীয় দিন থেকে প্রতিবাদ শুরু হলো। মোরগগুলো আর সকাল ডাকল না। বাঁদররা গান বন্ধ করে দিল। হাতিরা জঙ্গল পরিষ্কার বন্ধ করে দিল। এমনকি মৌমাছিরাও মধু তৈরি বন্ধ করল। জঙ্গল নিঃশব্দ, নীরস, বিষণ্ন হয়ে উঠল।

রাজা বুঝতে পারলেন না, সব আইন তো ভালোর জন্য, তা হলে এ অশান্তি কেন?

অবশেষে বুদ্ধিমান পেঁচা বলল, “প্রভু, আপনি নিয়ম করেছেন কুড়াল দিয়ে ফুল কাটার মতো। এতে ফুলের বোটা পাবেন ঠিকই, কিন্তু এর রঙ, সৌরভ ও পাপড়িগুলো হারিয়ে যাবে। অনুরূপ আপনার নিয়মগুলো আইন হয়েছে বটে, কিন্তু হৃদয় হারিয়ে গেছে।”

রাজা চুপ করে শুনলেন।

তখন বনের এক প্রবীণ কাছিম উঠে দাঁড়াল। সে ধীরে বলল,
“একটা কথা বলি প্রভু-
আপনি যদি গাছ কাটার আগে পাখিদের জিজ্ঞেস করতেন,
জল ভাগ করার আগে মাছদের মতামত জানতেন,
আর বাসস্থান রাজ্য করণের আগে গর্তবাসীদের ডেকে শুনতেন,
তবে তারা হয়তো নিয়ম মানতো নিজের মতো করেই।”

রাজা যেন একটা আয়নাতে নিজেকে দেখলেন। সত্যিইতো এবারের নিয়ম করা হয়েছে খুব তড়িঘড়ি করে, অন্যের মতামত না নিয়ে।

পরদিন তিনি ঘোষণা দিলেন, ”অরণ্য নীতি-১ বাতিল”।নতুনভাবে ‘অরণ্য সম্মতি সভা’ গঠন করা হবে, যেখানে প্রতিটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধি থাকবে।

বনবাসীদের নিয়ে খসড়া আলোচনা শুরু হলো- কে কোথায় থাকবে, কী খাবে, কখন চলবে – এসব ঠিক হলো আলোচনার মাধ্যমে।

দুই মাস পর ‘অরণ্য নীতি-২’ কার্যকর হলো। এবার কেউই বঞ্চিত বোধ করল না। নিয়ম ছিল, কিন্তু তা যেন ছিল নিজস্ব মতেরই প্রতিধ্বনি।

বন আবারও হাসতে লাগল। ঝর্ণা গর্জাল, মোরগ ডাকল, মৌমাছিরা মধু দিল আর হরিণও ছুটল আগের মত। আর রাজা – তিনি বুঝলেন সত্যি করে –

= “নিয়ম কেবল কাগজে চলে না, তা গড়ে উঠে সম্মিলিত হৃদয়ে। জনমত ছাড়া নিয়ম করা মানে হচ্ছে কারও জীবনযাপন ছেঁটে দেওয়া নিজের মাপে।”

সাইফুল ইসলাম পলাশ
১৯ জুলাই ২০২৫
তিতুমীর এক্সপ্রেস, দিনাজপুর।