ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি:

যুবসমাজকে যুব শক্তিতে রূপান্তরিত করতে যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা সময়ের অনিবার্য দাবি

রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সুবাতাস বয়ে দেওয়ার জন্য যুবসমাজকে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখতে পারে। আগামি দিনের দক্ষ জনশক্তি, কর্মকর্তা ও দক্ষকর্মী হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার জন্য জীবনে তাদের ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে। জাতীয় নানা সমস্যা ও সম্ভাবনার সাথে একাত্না হওয়ার মধ্যে দিয়েই যুবসমাজ জাতিগঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের যে গুণাবলী গুলো অর্জন করা অপরিহার্য তা হল-

*১. যুবকদের মনে তাক্বওয়ার বীজ বপন করা* :

মানুষের মধ্যে সৎ কাজের উদ্দীপক ও প্রেরণাদায়ক এবং অসৎ কাজ থেকে বাঁচার মত একটি শক্তিশালী অনুভূতির নাম হচ্ছে তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি। বর্তমানে ঘুণে ধরা যুবসমাজকে পাপাচার, মন্দকাজ ও নৈতিক অধঃপতন থেকে উত্তরণের সর্বোত্তম পথ হচ্ছে তাদের মধ্যে তাক্বওয়া বা আল্লাহভীরুতা সৃষ্টি করা। যখন সে জানবে এবং বুঝবে যে, আমার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ছোট-বড় যাবতীয় কথাবার্তা ও কর্মকান্ড আল্লাহপাক দেখছেন এবং ফিরিশতাগণ তা লিপিবদ্ধ করছেন। এর জন্য একদিন অবশ্যই আমাকে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। যখন সে বুঝবে যে, কবরের আযাব, হাশরের ময়দান এবং জাহান্নামের শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ, তখনই সে তার যাবতীয় উদ্যম, জোশ, বল-শক্তি, উদ্দীপনা ও চিন্তা-চেতনাকে সুসংহত রাখবে এবং অসৎ পথে ব্যবহার থেকে দূরে থাকবে। যা দুনিয়াবী কোন আইনের পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তারা ভুল করে কোন অন্যায় পথে পা বাড়ায় তাহ’লে তাক্বওয়ার বলেই তওবা করে নিজের পাপ কাজ অকপটে স্বীকার করে দুনিয়াবী যেকোন শাস্তিকে হাসিমুখে বরণ করে নেবে। এর বাস্তব প্রমাণ আমরা দেখতে পাই ছাহাবীদের জীবনে। যুবক মা‘ইয বিন মালিক (রাঃ) যেনা করার পর পরকালীন শাস্তির ভয়ে তওবা করে এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট নিজের অপরাধ স্বীকার করে। অতঃপর তাকে রজম করা হয়। একইভাবে আযদ বংশের গামেদী গোত্রীয় এক যুবতী মহিলা তাক্বওয়ার বলে বলীয়ান হয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট এসে নিজের যেনার অপরাধ স্বীকার করে। অতঃপর তাকেও রজম করা হয়। কোন সে আদর্শ ও শক্তি! যা ছাহাবীদেরকে নিজের অপরাধ স্বীকার করে দুনিয়াবী সর্বোচ্চ শাস্তি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল? এর জবাবে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, ইসলামী আদর্শ ও তাক্বওয়া। তাই যুবসমাজের মাঝে তাক্বওয়ার ভীতি অর্জন করতে পারলে ইনশাআল্লাহ তারা তাদের নীতি-নৈতিকতা ধূলায় ধূসরিত হতে দিবে না। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اتَّقُوْا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلاَ تَمُوْتُنَّ إِلاَّ وَأَنْتُم مُّسْلِمُوْنَ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং প্রকৃত মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না’ (আলে ইমরান ৩/১০২)।

*২. চরিত্র গঠনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আদর্শ গ্রহণ :*

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছিলেন উত্তম চরিত্রের মূর্ত প্রতীক। মহান আল্লাহ বলেন, وَإِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيْمٍ ‘তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী’ (কলম ৬৮/৪)। তাই যুবসমাজ সহ পৃথিবীর সকল মানুষকে অবশ্যই মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আদর্শে জীবন গঠন করতে হবে। তবেই সে নৈতিক অধঃপতনের পথ থেকে মুক্তি পাবে এবং উভয় জীবনে সফলতা লাভ করবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চরিত্রকে নমুনা হিসাবে উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন, لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِيْ رَسُوْلِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ’ (আহযাব ৩৩/২১)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে ঈমানে পরিপূর্ণ মুসলমান হচ্ছে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি’।
অথচ আজকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ যুবক আদর্শকে বাদ দিয়ে বিভিন্ন নেতার আদর্শ গ্রহণের মাধ্যমে নিজেকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। তাই “সকল নেতার পথ ছাড়া, বিশ্বনবীর পথ ধর” এই শ্লোগানকে বাস্তবে/হৃদয়ে ধারণ করতে হবে যুবকদেরকে।

 

*৩. পরকালীন জবাবদিহিতা ও নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি :*

যুবকদের মধ্যে পরকালীন জীবনের স্থায়ীত্ব ও জবাবদিহিতা সম্পর্কে চেতনা জাগ্রত করতে হবে। কেননা পার্থিব জগতের ক্ষণস্থায়ী জীবনের পর রয়েছে চিরস্থায়ী ও অনন্ত জীবন। সে জীবনের তুলনায় এ জীবন অত্যন্ত তুচ্ছ ও নগণ্য। মহান আল্লাহ বলেন,وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوْا يَعْلَمُوْنَ ‘এই পার্থিব জীবন ক্রীড়া কৌতুক বৈ কিছুই নয়। পরকালের জীবনই প্রকৃত জীবন। যদি তারা জানত’ (আনকাবূত ২৯/৬৪)। তিনি আরো বলেন, كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوْا إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا ‘যেদিন তারা একে (ক্বিয়ামতকে) দেখবে, সেদিন (তাদের) মনে হবে যেন তারা দুনিয়াতে এক সন্ধ্যা অথবা এক সকাল অবস্থান করেছে’ (নাযি‘আত ৭৯/৪৬)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, وَاللهِ مَا الدُّنْيَا فِى الآخِرَةِ إِلاَّ مِثْلُ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ فِى الْيَمِّ فَلْيَنْظُرْ بِمَ يَرْجِعُ ‘আল্লাহর কসম! আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ হ’ল, তোমাদের কেউ মহাসাগরের মধ্যে নিজের একটি অঙ্গুলি ডুবিয়ে দিয়ে লক্ষ্য করে দেখুক তা কি (পরিমাণ পানি) নিয়ে আসল’।(মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৫৬)।
জাবির (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একটি মৃত কানকাটা বকরীর বাচ্চার নিকট দিয়ে অতিক্রমকালে বললেন, তোমাদের মধ্যে কে আছে যে, একে এক দিরহামের বিনিময়ে ক্রয় করতে পসন্দ করবে? ছাহাবীগণ বললেন, আমরা তো একে কোন কিছুর বিনিময়েই ক্রয় করতে পসন্দ করব না। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এটা তোমাদের কাছে যতটুকু নিকৃষ্ট আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর চেয়েও নিকৃষ্ট’।(মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৫৭)
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এভাবে মানুষকে পরকালীন চেতনায় উজ্জীবিত করে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করেন। আমাদেরও তাঁরই দেখানো পথে যুবকদেরকে নৈতিক অধঃপতন থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

 

*৪. ছালাতে অভ্যস্ত করানো :*

মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاء وَالْمُنكَرِ ‘নিশ্চয়ই ছালাত মুমিনকে নির্লজ্জ ও অপসন্দনীয় কাজ হ’তে বিরত রাখে’ (আনকাবূত ২৯/৪৫)। পবিত্র কুরআনের সর্বাধিক আলোচিত বিষয় হ’ল ছালাত। ছালাতের বিধ্বস্তি জাতির বিধ্বস্তি হিসাবে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে’ (মারিয়াম ১৯/৫৯)। জাহান্নামী ব্যক্তির লক্ষণ হ’ল ছালাত ত্যাগ করা ও প্রবৃত্তির পূজারী হওয়া। তাই যুবসমাজকে ছালাতের প্রতি মনোযোগী করতে হবে এবং নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত মসজিদে আদায়ে অভ্যস্ত করতে হবে। তারা যদি ছালাতে অভ্যস্ত হয় তবে তারা অন্যায় পথ থেকে ন্যায়ের পথে ফিরে আসবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি এসে বলল যে, অমুক ব্যক্তি রাতে (তাহাজ্জুদের) ছালাত পড়ে। অতঃপর সকালে চুরি করে। জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বলেন, ‘তার রাত্রি জাগরণ সত্বর তাকে ঐ কাজ থেকে বিরত রাখবে, যা তুমি বলছ’। (আহমাদ হা/৯৭৭৭, মিশকাত হা/১২৩৭)

লেখক: অধ্যক্ষ শাহজালাল সবুজ