লেখক: জনাব এম এ আখের, পরিচালক (প্রশাসন), যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর।
“দাবা খেলা শেষ হলে রাজা-সেপাই সব গুটি একই কৌটায় রাখা হয়”—এই প্রবাদবাক্যটি শুধু একটি খেলার নিয়ম নয়, বরং এটি জীবনের এক অনিবার্য ও গভীর সত্যকে তুলে ধরে।
এই কথার মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে, জীবনের নানা পর্যায়ে মানুষ যতই ক্ষমতাধর, মর্যাদাবান বা প্রভাবশালী হোক না কেনো, শেষ পর্যন্ত সবাই সমান হয়ে যায়। ক্ষমতা, পদমর্যাদা কিংবা প্রভাব—সবই সময়সাপেক্ষ এবং ক্ষণস্থায়ী।
আমাদের কর্মজীবনেও এই প্রবাদটির প্রতিফলন দেখা যায়। একজন মানুষ চাকরির শুরুতে হয়তো একজন সাধারণ কর্মচারী হিসেবে যাত্রা শুরু করেন, তারপর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার জোরে পদোন্নতি পেতে পেতে সচিব বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়ে উঠেন।
কিন্তু অবসরের পর সেই মর্যাদা আর থাকে না। তখন আর কেউ তাঁকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে না, অফিসের গাড়ি, পিওন বা দপ্তরের কর্মচারীরাও আর পাশে থাকে না। বাস্তবতা হলো, তখন তিনি সমাজের একজন সাধারণ নাগরিক—যেমন একজন অফিস সহায়ক অবসরের পর হন।
এখানেই জীবনের আসল শিক্ষা লুকিয়ে আছে। কর্মজীবনে যখন কারো হাতে কিছু ক্ষমতা থাকে, তখন সেটির সঠিক ব্যবহারই প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে। অনেকেই ক্ষমতার মোহে অধস্তনদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন, তাদের মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে কুণ্ঠা বোধ করেন। অথচ তাঁরা ভুলে যান, এই পদমর্যাদার মোহ একদিন মুছে যাবে। আর অবসরের পর যেটা রয়ে যাবে, তা হলো মানুষের ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান—যা অর্জিত হয় সদাচরণ, সহানুভূতি ও সততার মাধ্যমে।
একজন ভালো কর্মকর্তা বা কর্মচারী শুধু কাজের দক্ষতায় নয়, মানুষের প্রতি আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃতভাবে শ্রদ্ধার পাত্র হন। যারা অধস্তনদের সম্মান করেন, তাদের পরামর্শকে মূল্য দেন, এবং সহানুভূতির সাথে সহকর্মীদের পাশে থাকেন, তারা কর্মজীবনের শেষে বা অবসরের পরও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেন। তারাই সামাজিকভাবে সম্মানিত থাকেন, অন্যদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠেন।
অন্যদিকে, যেসব মানুষ নিজেকে উচ্চতর মনে করে নিচের স্তরের কর্মীদের অবহেলা করেন, তাঁদের জন্য অবসরের পর জীবনের চিত্র ভিন্ন হয়। তখন আর কেউ খবর নেয় না, দেখা করে না, সম্মানও দেয় না। কারণ, মানুষ কেবল পদ দেখে শ্রদ্ধা করে না, তারা দেখে মানুষটি কীভাবে অন্যদের সঙ্গে আচরণ করতেন।
জীবনের এই রূপক ও বাস্তবতাকে মনে রেখে আমাদের উচিত কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে বিনয়ী ও মানবিক থাকা। মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই একদিন এক কৌটায় গিয়ে মিশে যাবো—কে ছিলাম রাজা আর কে ছিলো সেপাই, সেটা কেউ মনে রাখবে না। মানুষ শুধু মনে রাখবে, আমরা কেমন ব্যবহার করতাম। তাই, কর্মজীবনে সদাচরণ, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
