লেখক: এম. রশিদ আলী
চেয়ারম্যান, ভলান্টিয়ার নিউজ২৪.কম
চরাঞ্চলের মানুষের জীবন সত্যিই কষ্টের! নদী ভাঙ্গন, বন্যা, প্রতিকূল পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে তাদের জীবন সংগ্রামময়। চরাঞ্চল, যা সাধারণত নদী তীরবর্তী এলাকা বা দ্বীপাঞ্চলকে বোঝায়। এখানে বসবাসরত মানুষেরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন – বন্যা, নদী ভাঙ্গন এবং প্রতিকূল পরিবেশের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে। এই কারণে, চরাঞ্চলের মানুষেরা নানা ধরনের দুঃখ-দুর্দশার শিকার হন।
বাংলাদেশের নদীগুলোর গতিপথ পরিবর্তন এবং শীতকালে পলি জমার কারণে প্রতি বছর নতুন নতুন চর জেগে ওঠে আবার বর্ষাকালে পানির প্রবল স্রোতে নদী ভাঙ্গনে চর বিলুপ্ত হয়। চরের আয়তন ও বসবাসকারি লোকের সংখ্যা প্রতিনিয়তই পরিবর্তনশীল। সূত্রমতে, বাংলাদেশে ১০ লাখ হেক্টর আয়তনের চর রয়েছে। প্রতিবছর দেশে ৫২ বর্গকিলোমিটার নতুন চর সৃষ্টি হয় এবং ৩২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের চর নদী গর্ভে বিলীনও হয়ে যায়। চরে বসবাসকারি লোকের সংখ্যা প্রায় ২০ মিলিয়ন। চরের এই বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষাসহ হাজারও সমস্যা রযেছে।
বন্যা ও নদী ভাঙনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দেশে বন্যা যত বেশি হবে নদী ভাঙ্গনের হারও তত বৃদ্ধি পাবে। বন্যার পানির তীব্র স্রোত মাটিকে দূর্বল করে দেয় ফলে নদীর পাড় এবং সংলগ্ন এলাকা ভাঙ্গনের কবলে পড়ে। বন্যার কারণে নদীতে পলি জমে নদীর গভীরতা কমিয়ে দেয় এবং নদী ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ায়। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে প্রায় ৩২টি জেলা নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে, প্রতি বছর প্রায় ৮৭০০ হেক্টর জমি হারিয়ে যায়। ফলে প্রায় দুই লক্ষ মানুষ আবাদী জমি ও বসতি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়ে। (Alam et al 2017). নদী ভাঙ্গনের ফলে প্রতিবছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫ কোটি ডলার।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত জেলা কুড়িগ্রামে রয়েছে ছোট-বড় ১৬টি নদী । ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমর এ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত থাকায় বন্যা ও নদী ভাঙ্গন অত্যন্ত বেশি। জেলার মোট আয়তন ২২৪৫ বর্গকিলোমিটার এবং চর এলাকার আয়তন জেলার মোট ভূমির ২২%। জেলার ৪২০টির অধিক চরে প্রায় ৫-৬ লাখ লোক বাস করে। জেলার প্রায় ৬২২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা প্রাকৃতিক দূর্যোগের ক্ষেত্রে অতি উচ্চ ঝুকিপূর্ণ এবং প্রায় ২৭৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা উচ্চ ঝুকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। ১৬টি নদ-নদীর মধ্যে প্রায় সকল প্রধান নদীতেই বন্যা এবং নদীভাঙন হয়ে থাকে। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার এবং গঙ্গাধর নদীর কমপক্ষে ৩০টি পয়েন্টে বর্তমানে নদীভাঙনের সমস্যা হয়ে থাকে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হল যে এই অঞ্চলে প্রতি ৫-৬ বছরে একটি বিশাল বন্যার ঘটনা ঘটে।
রিভারস অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (RDRC) জানুয়ারী ২০২৩ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি তথ্য, বিভিন্ন একাডেমিক গবেষণাপত্র এবং সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বলা হয়েছে দেশের ৭৯টি নদী হয় শুকিয়ে যাচ্ছে অথবা ইতিমধ্যেই শুকিয়ে গেছে। তন্মধ্যে খুলনা বিভাগে ২৫টি, রাজশাহীতে ১৯টি, রংপুরে ১৪টি, চট্টগ্রামে ০৬টি, ময়মনসিংহে ০৫টি, ঢাকায় ০৪টি এবং বরিশাল ও সিলেট বিভাগে ০৩টি করে নদী রয়েছে।
উক্ত তালিকায় কুড়িগ্রাম জেলার ০৩টি উল্লেখযোগ্য নদী তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমরেরও নাম রয়েছে। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে শুকিয়ে গেলে নদীর গভীরতা কমে যায়, ফলে নদীর জলধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। বর্ষাকালে অতিরিক্ত জল প্রবাহের কারণে নদীর দুই তীরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এই অতিরিক্ত চাপের কারণে নদীর পাড় ভেঙে যায়। এছাড়াও নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে নদী ভাঙ্গনের সৃষ্টি করে। যদিও তালিকায় কুড়িগ্রামের তিনটি নদীর নাম রয়েছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ জেলার সকল নদীরই অবস্থা একই রকম। তাছাড়া ভারত থেকে কোন কোন সময় অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেয়ার কারণেও এ জেলার নদী ভাঙ্গনের হার অনেক বেশি।
কুড়িগ্রামের সব কটি উপজেলার চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নদীভাঙনের ক্ষতিকর প্রভাব বর্ণনাতীত। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যারা বাঁধের বাইরে বসবাস করে এবং কিছু মানুষ যারা দুর্বল এবং অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার বাঁধে বাস করে তারাই ভাঙ্গনের শিকার হয়। ক্ষতিগ্রস্থদের অধিকাংশই কৃষক, অল্প সংখ্যক শ্রমিক, মৎসজীবী, ভ্যান ও ঘোড়ার গাড়ি চালক এবং নৌকার মাঝি। নদী ভাঙ্গনের ফলে অবকাঠামো, জীবিকা এবং বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ধ্বংস সাধিত হয়। চরাঞ্চলের কৃষিজমি, বসতি, গবাদিপশু এবং সম্পত্তি হারিয়ে অধিবাসীরা ধীরে ধীরে ভূমিহীন হয়ে পড়ে এবং চরভূমি থেকে স্থানান্তরিত হতে হয়। চরের বাস্তুচ্যুত এ মানুষগুলো কর্মসংস্থানের অভাবে চরম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, দক্ষতার অভাবে ভালো কাজ পায় না কিংবা কাজের পারিশ্রমিক নিয়ে তাদের দর কষাকষির ক্ষমতা খুব একটা থাকে না। অনেকেই নির্মাণ, গৃহস্থালির কাজ বা ইট তৈরির মতো অনানুষ্ঠানিক কাজে নিযুক্ত হন, যেখানে শ্রম আইন এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার মান ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত। তাদেরকে বাধ্য হয়েই বিপজ্জনক পরিবেশে কম মজুরিতে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়।
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় পরিবেশ ও ভৌগোলিক তথ্য পরিষেবা গবেষণা অনুযায়ী কুড়িগ্রামের বিভিন্ন নদীর ভাঙ্গনে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। এই ক্ষতির মধ্যে আবাদি জমি, গবাদিপশু, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় অবকাঠামো ধ্বংস অন্তর্ভুক্ত। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের ২০২০ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙ্গনে কুড়িগ্রামে গড়ে ২০০ থেকে ৫০০ হেক্টর, ধরলা নদীর ভাঙ্গনে ২০০-৩০০ হেক্টর, তিস্তা নদীর ভাঙ্গনে ১০০-১৫০ হেক্টর জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)-এর প্রতিবেদন অনুসারে কুড়িগ্রামে প্রতি বছর গড়ে ২০,০০০-৩০,০০০ মানুষ নদী ভাঙনের শিকার হয়ে বাস্তুহারা হয় (UNDP, 2019) । দ্য ডেইলি স্টার এর ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয় গত ১০ বছরে নদীর ভাঙ্গনে উত্তরাঞ্চলের ১০,০০০+ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে যার সামগ্রিক আর্থিক ক্ষতি ২০০-৩০০ কোটি টাকা। ২০২২ সালের বন্যায় কুড়িগ্রামে ৮৫% ফসলী জমি প্লাবিত হয় যা স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ২০২২)। ২০২০-২০২৩ সালের মধ্যে নদীভাঙনে কুড়িগ্রামের ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে (স্থানীয় প্রশাসন, ২০২৩)। ২০২১ সালে ব্রহ্মপুত্রের তীব্র স্রোতে কুড়িগ্রাম-চর রাজিবপুর সড়কের ১০ কিলোমিটার অংশ বিলীন হয়ে যায় (দৈনিক প্রথম আলো, ২০২১)। দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার ২০২২ এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয় নদীর ভাঙ্গনে কুড়িগ্রামে এক মাসে ২০০+ বাড়ি ও ৫০ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয় যার ক্ষতি প্রায় ১০ কোটি টাকা। গবেষণা পত্র জার্নাল অফ হাইড্রোলজি-এর ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয় যে নদীর ভাঙ্গনের ফলে প্রতি বছর গড়ে ১% – ২% কৃষি জমি হ্রাস পায় যা উত্তরাঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রতি বছর ৫০-৬০ কোটি টাকা ক্ষতির কারণ হয়। তবে এই পরিসংখ্যানগুলো ভৌগোলিক অবস্থান ও সময়ভেদে পরিবর্তনশীল হতে পারে।
নদী ভাঙনের শিকার মানুষদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং গভীর। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে তারা শুধু তাদের ঘরবাড়ি, জমিজমা এবং জীবিকাই হারান না বরং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ে এবং মাথা ব্যথা, ক্লান্তি ও খাদ্য পরিপাকে সমস্যার সৃষ্টি হয়। নতুন পরিবেশে অভিযোজিত হতে সময় লাগে এবং অনেক ক্ষেত্রে নদী ভাঙ্গা মানুষকে অন্যরা উদবাস্তু ভেবে হেয় প্রতিপন্ন করে। মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, সম্পত্তি এবং পরিচিত পরিবেশের ক্ষতির জন্য শোক অনুভব করে।
পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলের মানুষের শান্তিপূর্নভাবে ঘুমাতে পারার নিশ্চয়তা আছে কিন্তু চরবাসী যে ঘরে ঘুমায় সেটি নিয়েও আছে অনিশ্চয়তা, ঘুমের মধ্যেই নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার অনেক ঘটনা আছে। তাদের আপনজনের কবরও যখন তখন ভেসে নিয়ে যায়। তাদের পরিশ্রমে গড়া ফসল ঘরে তোলা নিয়ে কখনও আত্মবিশ্বাসী হতে পারে না। এতকিছুর পরও নদীকে এড়িয়ে মানুষের জীবন গড়া ও সভ্যতার ঐশ্বর্য নির্মাণ অকল্পনীয়।
গ্রীন ভিলেজ ইয়ুথ ফাউন্ডেশন কুড়িগ্রামের সাধারণ সম্পাদক মোঃ সাইদুল হাসান সাঈদ বলেন, ‘নদী ভাঙ্গনের সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু জিও ব্যাগ স্থাপন এবং বন্যার সময় পানিবন্দী মানুষের হাতে কিছু ত্রাণ সামগ্রী তুলে দেয়া চরবাসী কিংবা নদী অববাহিকার মানুষের জন্য পর্যাপ্ত নয় কিংবা এটি স্থায়ী কোন সমাধানও নয়।’
বিশ্বের ছোট বড় মিলে ২৭টি সভ্যতার মধ্যে প্রায় সভ্যতাই গড়ে উঠেছে নদ-নদীকে ঘিরে। বস্তুত মানবসভ্যতা ও নদী পরস্পর সম্পর্কিত এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিপূরক বললেও ভুল হবে না। নদীকে কেন্দ্র করেই মানবসভ্যতার উৎপত্তি, বিকাশ ও বিস্তার ঘটেছে। মানব সভ্যতার বাস্তবতার আলোকে ও চরবাসীর দু:খ দূর্দশার প্রেক্ষাপটের সার্বিক বিবেচনায় স্থায়ী সমাধানের জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা জরুরি এবং চর অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য চর উন্নয়ন অধিদপ্তর বা চর উন্নয়ন মন্ত্রণালয় গঠণ করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক নুসরাত সুলতানা বলেন, “চরবাসীর দুঃখ দুর্দশা সমাধানের জন্য বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ সহ সবাইকে সচেতন করার পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের কাছে চর উন্নয়ন ইউনিট বা চর উন্নয়ন মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং খুব দ্রুত চরবাসী এর সুফল পাবে।”
