ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি: কয়েকদিন আগে এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হলো। ভদ্রলোক জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদে কর্মরত। তিনি একটি বিশেষ  আইন নিয়ে সেমিনার কর‍তে চান। আমাকে সেখানে বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

প্রথম দেখায় মনে হলো উনাকে কোথায় যেন দেখেছি। উনিও আমাকে বললেন, স্যার, আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি। আমরা কেউই মনে করতে পারছি না। মনে মনে একটা জিনিস ভেবে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কোন কোন সংস্থায় কাজ করেছেন? জানালেন, তিনি এর আগে SC সংস্থায় কাজ করেছেন। তার উত্তরের সাথে আমার ভাবনার মিল পেলাম না। আমি তাদের কাছে কিছু ম্যাটেরিয়ালস নিয়ে পরের দিনের সেমিনারের জন্য প্রস্তুতি নিলাম।

মনে পড়ে গেল ১৬ বছর আগের কথা। আমি তখন আরডিআরএস বাংলাদেশ সংস্থায় সিনিয়র ম্যানেজার (লিগ্যাল) পদে চাকুরী করতাম। জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত সংস্থায় আইন সংশ্লিষ্ট একটি পদে কয়েকজন বন্ধু এপ্লাই করেছিলাম। অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে আমি এবং আমার বন্ধু সেলিম রেজা লিখিত পরীক্ষার জন্য শর্ট লিস্টেড হলাম। পরীক্ষায় দুজনেই পাশ করলাম।

মৌখিক পরীক্ষার দিনে আমার সামনে  ৪/৫ জনের Viva Voce হলো। একেক জন গড়ে ৫/৭ মিনিট করে ছিল। কিন্তু আমার বেলায় দেখি ছাড়ছেই না। একজন বিদেশী, একজন ন্যাশনাল কনসালটেন্ট (রিটায়ার্ড ডিস্ট্রিক্ট জাজ), প্রজেক্ট ম্যানেজার ও আরেকজন অফিসার বোর্ডে ছিল। বের হতেই বন্ধু সেলিম জানালো, পাক্কা ৩০ মিনিট ভাইভা দিলি। তোর চাকুরি কনফার্ম।

সে সময় ভাইভা বোর্ড থেকে একজন স্মার্ট ফিমেল অফিসার বের হয়ে আমাকে কাছে ডেকে নিলেন। তিনি বললেন, আপনার পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। শীঘ্রই আপনাকে অফিসিয়ালি সেকেন্ড ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হবে। আপনি কখনোই 40K এর নীচে স্যালারি চাবেন না।

উনার এমন কথা শুনে আমি যেন হাওয়ায় ভাসছিলাম। আমার পরে শেষ পরীক্ষার্থী S নামের একজন ফিমেল ক্যান্ডিডেট ভাইভা বোর্ডে ঢুকলেন এবং ৩/৪ মিনিটের মধ্যে বের হয়ে আসলেন।

সত্যিই সত্যিই এক সপ্তাহের মধ্যে জাতিসংঘের সেই সংস্থা থেকে সেকেন্ড ইন্টারভিউয়ের জন্য কল পেলাম। বললেন, সেখানে টপ ম্যানেজমেন্টের সদস্যরা আমার সাথে কথা বলবেন।

আমি ঠাকুরগাঁও থেকে সেই রাতেই টিকেট কেটে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পরের দিন সকালে আমার ভাইভা। এনজিও তে চাকুরী করে জুতো কালি করার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। সেদিন সকাল সকাল জুতা কালি করে সিএনজি ঠিক করছিলাম। ঠিক সেই সময় সেই সংস্থার এডমিন অফিসার ফোন করে বললেন, আপনার ইন্টারভিউটি অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী তারিখ আপনাকে জানিয়ে দেওয়া হবে।

আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। বলে কী লোকটা! ভাইভার দিনে এভাবে কেউ পরীক্ষা স্থগিত করে!!
আমি ভীষণ হতাশ হয়ে ঠাকুরগাও ফিরে আসলাম।
ইতোমধ্যে আমার মানবাধিকার সংস্থা ব্লাস্টে ‘রিসার্চ লইয়ার’ পদে চাকুরী হলো। আমি ঢাকায় শিফট হলাম। সেখানে চাকুরী করলেও আমি প্রায়ই আনমনে মোবাইল চেক করে দেখতাম সেই সংস্থা থেকে মেসেজ বা ফোন এসেছে কি না।

একদিন হাইকোর্টে একটা কাজে গিয়েছি। সেখানে সেই S আপার সাথে দেখা হয়ে গেলো। কুশলাদি বিনিময়ের পরে জানতে পারলাম তিনিই সেই পদে জয়েন করেছেন। তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বাসায় ফিরলাম। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছিল আমার ভাগ্যটাকে কেউ ছিনিয়ে নিয়েছে। গত ১৬ বছরে যখনই সেই সংস্থার নিউজ বা লোগো দেখেছি তখনই অপ্রাপ্তির ক্ষতটা জেগে উঠতো। নিজের মনকে স্বান্তনা দিয়েছি নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী।

যাইহোক, ভদ্রলোকের সাথে পূর্ব নির্ধারিত সেমিনার শেষে একসাথে আলাদাভাবে কিছু সময় কাটালাম। আইনটির বিভিন্ন ত্রুটি এবং আরো কি কি করা যায় সে বিষয়ে কথা বললাম। বললেন, স্যার, এই বিষয়গুলো নিয়ে কেউ কখনো বলেনি। আমরা শীঘ্রই এ বিষয় নিয়ে পলিসি এডভোকেসি করব। আইনের মধ্যে বিষয়গুলো সংযোজনের চেষ্টা করব।

কৌতুহলবশত জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি সত্যিই SC    ছাড়া আর কোনো জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থায় কাজ করেন নি? বললেন, ২০০৭ সালে একটা সংস্থায় ১১ মাস ছিলেন। অল্প সময় ছিলেন তাই সেটার পরিচয় কাউকে দেন না। একদম খাপের খাপ মিলে গেল। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। এই সেই ব্যক্তি যিনি সেই বোর্ডের প্রধান ছিলেন। আমি তাকে সেই কথা স্মরণ করিয়ে লজ্জা দেইনি, প্রতিশোধ পরায়ণও হয়নি। বরং, নিজ আসন ছেড়ে ভিজিটরের চেয়ারে গিয়ে তার পাশে বসলাম। আর বললাম, আসুন আমরা দেশের জন্য একসাথে কাজ করি।

আমি কোনদিন কল্পনাও করি নি সেই ভদ্রলোকের সাথে আমার আবার দেখা হবে। সে সময় তিনি আমাকে মূল্যায়ন না করলেও আজ সময়ের ব্যবধানে আমার প্রতিটি কথাই তার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। এ দুনিয়ায় কেউ জানে না আগামীকাল কি ঘটবে। পৃথিবীর অসংখ্য ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আজ যে বন্দী কাল সে রাজা, আজ যে জমিদার কাল সে ফকির। আজ আপনি যার দ্বারস্থ হয়েছেন, কাল সেও আপনার দ্বারস্থ হতে পারে।

(বি. দ্র. ঘটনা সত্য। সংস্থা ও নিয়োগকারীর নাম গোপন করা হয়েছে)

  লেখক: সাইফুল ইসলাম পলাশ
অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, রাজশাহী