লেখক: অধ্যক্ষ শাহজালাল সবুজ

*৫. পরিবারকে শিষ্টাচার শিক্ষার কেন্দ্রে রূপান্তর করা:*

পিতা-মাতার দায়িত্ব হ’ল তারা ছেলে-মেয়েদেরকে উত্তম উপদেশ প্রদান করবেন। সন্তানদের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে তারা ইসলামী আদর্শে গড়ে উঠে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করতে সচেষ্ট হয়। মহান আল্লাহ বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيْكُمْ نَاراً وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেকে এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে বাঁচাও, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর’ (তাহরীম ৬৬/৬)।
সন্তানদেরকে উত্তম পথে আনার ব্যাপারে লুকমান হাকীম কর্তৃক তাঁর পুত্রের প্রতি প্রদত্ত নয়টি উপদেশ পিতা-মাতার জন্য বিশেষভাবে লক্ষণীয় (লুকমান ৩১/১৩-১৯)।

সাধারণত পিতা-মাতার স্বভাব-চরিত্রের উপর সন্তানের স্বভাব-চরিত্র গড়ে উঠে। এজন্য পিতা-মাতাকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হ’তে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেছেন, ‘প্রত্যেক সন্তান ফিৎরাতের (ইসলামী স্বভাব) উপর জন্ম গ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী, খ্রিস্টান ও অগ্নিপূজক করে গড়ে তোলে’।[ মুত্তাফাকুন আলাইহ, মিশকাত হা/৯০]
তাই পিতা-মাতার কর্তব্য সন্তানকে শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া। তাহ’লে তারা উত্তম চরিত্রের অধিকারী হবে ইনশাআল্লাহ।

*৬. পিতা- মাতা ও বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা:*

পিতামাতার সাথে ভালো ব্যবহার করবে। যদি তাদের একজন অথবা দুইজনেই বৃদ্ধ অবস্থায় বেঁচে থাকেন তবে তাদের সাথে উহ! শব্দটা পর্যন্ত করবে না। তাদের তুচ্ছ জ্ঞান করে ধমক দিয়া কথা বলবেনা । তাদের সাথে মিষ্টি ভাষায় কথা বলবে। তাদের সামনে যাবে অত্যন্ত বিনয় বিনম্রভাবে ও দয়াদ্র চিত্তে আর বলবে, “হে প্রভু তাদেরকে সেইরূপ প্রতিপালন করুন যে রূপে তারা আমাদেরকে ছোটবেলায় লালন পালন করেছিলেন। তোমার প্রভু তোমার অন্তরের খবর রাখেন । তোমরা যদি সৎ হয়ে যাও তবে মনে রেখো আল্লাহ প্রার্থনা করির প্রার্থনা মঞ্জুর করেন।’- সূরা বনী ইসরাঈল।

*৬. বন্ধু নির্বাচনে ভুল না করা:*

কথায় বলে, সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ। যুবসমাজকে নৈতিক বলে বলীয়ান ও উন্নত করতে হ’লে সৎসঙ্গ গ্রহণ ও অসৎসঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। সৎ ও চরিত্রবান বন্ধুদের সাথে থাকলে তারাও তাদের গুণে গুণান্বিত হবে এবং কল্যাণের পথে পরিচালিত হবে। বন্ধু নির্বাচন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘সৎসঙ্গ ও অসৎসঙ্গের দৃষ্টান্ত হচ্ছে কস্ত্তরি বিক্রেতা ও কামারের হাপরে ফুঁক দানকারীর ন্যায়। কস্ত্তরি বিক্রেতা হয়তো এমনিতেই তোমাকে কিছু দিয়ে দিবে অথবা তুমি তার কাছ থেকে কিনে নিবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে সুঘ্রাণ অবশ্যই পাবে। আর কামারের হাপরের ফুলকি তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ পুড়িয়ে দিবে অথবা তুমি তার নিকট থেকে দুর্গন্ধ অবশ্যই পাবে’।[ মুক্তাফাকুন আলাইহ, মিশকাত হা/৫০১০]

*৭. সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা:*

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আগে আমরা দেখতাম গ্রামে গঞ্জে শিশু, কিশোর, তরুণরা যখন পাথর/ মার্বেল দিয়ে খেলতো দূর দিয়ে যদি একজন মুরুব্বী যাওয়া দেখতো তাহলে অনেক আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করত, এটি যেন একটি সামাজিক শাসনের প্রতিচ্ছবি কিন্তু বর্তমান আমরা কি দেখতে পাচ্ছি শহুরে জীবন তো বাদেই দেন গ্রামীণ জীবনেও এখন যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে মুরুব্বীদের ভয় করা/ সম্মানবোধ তো বাদই দেন বরং দেখা যাচ্ছে একই ফ্যামিলিতে একই ঘরে বসে ছেলে, বাবা, দাদা একসঙ্গে জুয়া খেলছে, তাস ফেলছে, বিভিন্ন অসামাজিক আড্ডা দিচ্ছে! আমাদের সামাজিক অবক্ষয় কোথায় নেমে গেছে! ভাবতে অবাক লাগে! আবার সমাজে এমন কিছু কালচারও তৈরি হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ কিছু ইবাদত- বন্দেগি (নামাজ, রোজা, হজ) করার মাধ্যমে নিজেকে অনেক বুজুর্গ হিসেবে আত্ম তৃপ্তিতে ভুগছেন “নিজ ভালো তো জগৎ ভালো” সমাজ কোথায় গেল এটা নিয়ে চিন্তা করার তার বিষয় নয়! অথচ সময়ের ব্যবধানে তার ছেলে নাতিপুতিরাও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তখন শুধু নিজে নিজেই আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না। সুতরাং এখনই সময় আসুন সামাজিক এই অপরাধগুলো দেখে দেখে শুধু সয়ে যাওয়াই নয় বরং সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গরে তোলার বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় আগামী প্রজন্মকে ঠেলে দেওয়া হবে ধ্বংসের দিকে।

*৮. যথাসময়ে বিবাহ সম্পন্ন করা :*

ইসলাম বিবাহকে করেছে সহজ অথচ আমাদের সামাজিক কালচার এটিকে করেছে অনেক কঠিন। বিবাহ হচ্ছে বয়সের সাথে সম্পর্কিত। ছেলে এবং মেয়ের বিবাহের উপযুক্ত বয়স হলেই বিবাহ দেওয়া পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের দায়িত্ব। এতে তাদের মন-মস্তিষ্ক বাজে চিন্তা থেকে মুক্ত থাকে এবং চরিত্র উন্নত হয়। আমাদের সমাজে বিবাহের ক্ষেত্রে বয়সের গুরুত্ব না দিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় ছেলে বা মেয়ের চাকরি আছে কিনা? যৌতুক দিতে পারবে কিনা? সামর্থ্য থাক বা না থাক অনারম্বর অনুষ্ঠান করতে পারবে কিনা ইত্যাদি বিবাহ সাদির ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে ছেলেমেয়েরা উপযুক্ত সময় বিয়ে করতে না পেরে জড়িয়ে পড়ছে অবৈধ প্রেম, ইভটিজিং, এমনকি ধর্ষণের মত নোংরা কাজে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা তা চক্ষুকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাযত করে। আর যে সামর্থ্য রাখে না সে যেন ছিয়াম রাখে। কেননা তা তার প্রবৃত্তিকে দমন করার জন্য উপযুক্ত মাধ্যম’।[ মুত্তাফাকুন আলাইহ, মিশকাত হা/৩০৮০]

 

*৯. শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো :*

মহান আল্লাহ বলেন, اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِيْ خَلَقَ ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন’ (‘আলাক ১)। এর মাধ্যমে শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য যে, নৈতিক ও বৈষয়িক জ্ঞানের সমন্বয়ে প্রণীত শিক্ষা ব্যবস্থাই হ’ল পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা ব্যবস্থা। মানবীয় জ্ঞানের সাথে যদি অহি-র জ্ঞানের আলো না থাকে, তাহ’লে যে কোন সময় মানুষ পথভ্রষ্ট হবে এবং বস্ত্তগত উন্নতি তার জন্য ধ্বংসের কারণ হবে। বিগত যুগে কওমে নূহ, আদ, ছামূদ, শো‘আয়েব এবং ফেরাঊন ও তার কওমের পরিণতি, আধুনিক যুগে ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং সাম্প্রতিককালের বসনিয়া, সোমালিয়া, কসোভো এবং সর্বশেষ ইরাক ও আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন ট্রাজেডী এসবের বাস্তব প্রমাণ বহন করে।

যুবসমাজের নৈতিক অধঃপতন প্রতিরোধে তাওহীদ ও রিসালাতের ভিত্তিতে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। দেশে প্রচলিত মাদরাসা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার দ্বিমুখী ধারাকে সমন্বিত করে একক ও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
*১০. শিক্ষাঙ্গনকে লেজুরভিত্তিক রাজনীতি মুক্ত রাখা :*
বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেজুর ভিত্তিক ও নোংরা রাজনীতি এবং দলাদলির নামে মারামারি, কাটাকাটি ও বিভিন্ন অশ্লীল কর্মকান্ড ঘটে থাকে। শিক্ষাঙ্গন গুলোতে লেজুর ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছে ছাত্রদেরকে। ভাবতে অবাক লাগে, ক্যাম্পাসে একই ক্লাস রুমে বসে সহপাঠীরা ক্লাস করছে আবার তারাই এই রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে এক সহপাঠী অপর সহপাঠীকে খুন করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহকে সর্বপ্রকারের দলাদলি মুক্ত রাখতে হবে। এছাড়া মুসলমানদের ঈমান, আক্বীদা, আমল-আখলাক বিনষ্টকারী যাবতীয় প্রকার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহকে মুক্ত রাখতে হবে। সেখানে বয়স, যোগ্যতা ও মেধাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে।

ধারাবাহিক আলোচনা চলবে…..