লেখক: সাদ্দাম মন্ডল, কুড়িগ্রাম: যাদের একটু সামর্থ্য আছে, তারা সাধারণত সরকারি সদর হাসপাতালে যেতে চান না। এমনকি কিছুটা নিম্নমানের হলেও কোনো বেসরকারী ক্লিনিক বেছে নেন। এর পেছনে মূল কারণ হয়তো হাসপাতালগুলোর ‘পরিবেশ’।
ক্লিনিকগুলোর মান যেমনই হোক, সেখানকার পরিবেশ অন্তত সরকারি হাসপাতালগুলোর চেয়ে কিছুটা ভালো—যা কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালসহ আরও অনেক সরকারি হাসপাতালেই অনুপস্থিত।
এই যে আবর্জনার স্তূপটি দেখছেন, এটি কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের পাশের একটি রুমের দৃশ্য। এটি দিনে সম্ভবত মাত্র একবার পরিষ্কার করা হয়, আর ময়লা ফেলার ড্রামও মাত্র একটি! সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই বর্জ্যের ঠিক পাশের রুমেই দিন-রাত পার করছেন শত শত মানুষ। যেখানে কোনো বেড নেই; ফলে তিন-চার দিন আগে সন্তান প্রসূতি নারীসহ বহু আত্মীয়স্বজন মেঝের মধ্যেই শুয়ে আছেন।
যার মাত্র চার দিন আগে সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে, তার কেমন পরিবেশে থাকা উচিত? অবশ্যই একটি স্বাস্থ্যকর ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশে—যাতে তাঁর অস্ত্রোপচারের স্থানে ছত্রাক, ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ না ঘটে। অথচ সেই মা বাধ্য হয়ে স্যাঁতসেঁতে মেঝেই শুয়ে আছেন, শুধু তাঁর নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, সন্তানের পাশে কেন মা নেই? কারণ হলো, নবজাতকের রুমে একজনের বেশি থাকার অনুমতি নেই। যে একজন থাকবেন, তাকে সারাক্ষণ টুলের ওপর বসে থেকেই শিশুটির সব যত্ন নিতে হয়—শোয়ার কোনো সুযোগ নেই। নবজাতককে জীবাণুমুক্ত রাখা ও ওয়ার্ডের পরিবেশ ভালো রাখার জন্য এটি অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু একজন সদ্য প্রসূতি মায়ের পক্ষে কি এভাবে সারাক্ষণ টুলের ওপর বসে থেকে সন্তানের দেখাশোনা করা সম্ভব?
কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার অনেক রুমই বন্ধ রাখা হয়; সেখানকার কোনো কার্যক্রম নেই। অথচ শত শত রোগী বেড না পেয়ে মেঝেই শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন! পর্যাপ্ত রুম থাকা সত্ত্বেও কেন সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে না? নার্স বা পর্যাপ্ত জনবলের অভাবেই কি এমনটা হচ্ছে? কেউ সঠিক তথ্য জেনে থাকলে দয়া করে জানাবেন।
হাসপাতালটির চিকিৎসা ব্যবস্থার অবস্থা আরও ভয়াবহ। সকালে ডাক্তার একবার রাউন্ডে এলেই এমবিবিএস ডাক্তারের দায়িত্ব শেষ! বিকেলে আসা রোগীকে পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় জরুরি বিভাগের (ইমার্জেন্সি) ডাক্তারের ওপর, কারণ রাতে কোনো চিকিৎসক রাউন্ডে আসেন না। আর শুক্রবার হলে তো কথাই নেই—শিশু ওয়ার্ড ছাড়া পুরো হাসপাতালে আর কোনো ডাক্তার রাউন্ডেই আসেন না!
দেশের প্রতিটি জেলা ও বিভাগে কত হাজারো চিকিৎসক, অথচ সরকারি হাসপাতালে কেন চিকিৎসকের এত ঘাটতি? প্রতিদিন সকাল ও রাতে অন্তত দু’বার যদি চিকিৎসকরা রাউন্ডে আসতেন, তাহলেও রোগীরা কিছুটা স্বস্তি পেতেন।
একটি তিতা সত্য হলো—সরকারি হাসপাতালের একজন আয়া, নার্স বা কর্মচারী যে বেতন পান, কোনো বেসরকারি ক্লিনিকের কর্মচারীরা তা পান না। সরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ডে যে পরিমাণ নার্স থাকেন, ক্লিনিকে তার অর্ধেকও থাকেন না। তা সত্ত্বেও ক্লিনিকে রোগীরা নার্সদের কাছ থেকে যে ব্যবহার ও সেবা পান, তা সরকারি হাসপাতালে বিরল। যদিও কিছু নার্স ব্যতিক্রম—তাঁরা আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল; তবে বেশিরভাগ নার্সের মেজাজ যেন সবসময় ১০০° সেলসিয়াসেই উঠে থাকে!
যারা শিশু ওয়ার্ডে গেছেন, তাঁরা এই ভোগান্তি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। বাইরে লেখা থাকে—‘স্যান্ডেল পরে ভেতরে যাওয়া নিষেধ’ এবং ‘নিজ দায়িত্বে স্যান্ডেল রাখুন, হারিয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়’। রোগীরা বাধ্য হয়ে বাইরে স্যান্ডেল রেখে ভেতরে যান, আর বের হয়ে দেখেন জুতো গায়েব! দিনে যে কত জোড়া স্যান্ডেল চুরি হয়, তার কোনো হিসাব নেই।মানুষ যে কতটা অসহায় হতে পারে, তা সরকারি হাসপাতালে এলে বোঝা যায়। রাতে একটু ঘুমের আসায় সেই নোংরা মেঝের ওপরই শুয়ে পড়ছেন হাজারো রোগীর স্বজন।
আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কি আদৌ কখনো উন্নতি হবে? কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের এই চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা তদারকি করার মতো কি কোনো দায়িত্ববান ব্যক্তি বা শক্তিশালী কোনো কর্তৃপক্ষ কখনোই থাকবে না?
